বুয়েটের বুলেট ফখরুল হাসান!!



ফুটবল তার ভালবাসা। যেমন ভাল পড়াশোনায়, তেমন ভাল ফুটবল খেলাতেও। ক্যাম্পাসের সবাই তাকে একনামে চেনে ক্যাম্পাসের সাড়া জাগানো ফুটবলার, খেলেন মধ্যমাঠে। মধ্যমাঠে খেলার পেছনেও তার আছে নিজস্ব দর্শন। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ফেস্টে গান গেয়েও মাতিয়ে চলেছেন সমান ভাবে। ফখরুল হাসান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(BUET)-এ যন্ত্রকৌশল বিভাগের ছাত্র। বুয়েট ক্যাম্পাসে একজন প্রিয় ও পরিচিত মুখ।

বিডিইয়ুথ-এর সাথে অন্তরঙ্গ এক অড্ডায়...

বুয়েট ক্যাম্পাসের সবাই জানে ফখরুল হাসান একজন অসাধারণ ফুটবল খেলোয়াড়, কিন্তু এই ফুটবল খেলার শুরুটা কিভাবে?

আমার ফুটবল খেলার শুরুটা বেশ মজার। অষ্টম শ্রেনীতে যখন ছিলাম তখন স্কুলে ক্রিকেট খেলার চলটা খুব বেশি ছিল। তবে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে প্রায়ই দেখা যেত, এ ব্যাট করতে পারল না ও কে বোলিং দেয়া হল না ব্যাটিং-এ কে আগে নামবে এসব ঠুনকো ব্যাপার নিয়ে মনোমালিন্য হতোতাই একদিন এর সহজ সমাধান হিসেবে ক্রিকেট বাদ দিয়ে ফুটবল খেলা শুরু হল। সেখান থেকেই শুরু।

নিজেকে কোন ফুটবলারের সাথে তুলনা করতে পছন্দ করেন?

ছোটবেলা থেকেই মেসির খেলা দেখে এসেছি তাকে আদর্শ মেনেছি। আমি সবচেয়ে বড় ভক্ত তারই। তবে তাদের মত খেলোয়াড়ের সাথে নিজের তুলনা করাটা আসলে সম্ভব না। তাই তুলনা করার চেষ্টাও করি না। মেসি, ইনিয়েস্তা খেলোয়াড় হিসেবে এ দুজনকে আমার অনেক ভাল লাগে তাই তাদের খেলার ধরন অনুসরণ করার চেষ্টা করি তাদেরকে দেখে শেখার চেষ্টা করি।

ক্যাম্পাসে সবাই কোন ফুটবলারের নামে ডাকে? কেমন লাগে তারা ডাকলে?

ক্যাম্পাসে সবাই আমাকে ফুটবলার হিসেবে জানে। আমরা বন্ধুরা মজা করে একজন আরেকজনকে অনেক ফুটবলারের সাথেই তুলনা করি। ইনিয়েস্তা, জাভি থেকে শুরু করে বালোতেল্লি, বোয়েটাং এর নামও চলে আসে তখন। প্রশংসা বা মজা যেটাই হোক, এ সবকিছুই অনেক উপভোগ করি। তারা যখন ফুটবল নিয়ে কোন কিছু জানতে চায় তখন অবশ্যই অনেক ভাল লাগে।

পড়ালেখা আর ফুটবল, দুটো একসাথে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয় না?

সারাদিন পড়ালেখা করার মত মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না। ফুটবল আমার ভাল লাগে তাই খেলি না, ভালবাসি তাই খেলি। দিনে যত কাজই থাকুক, সবসময় বিকেলের দুই ঘন্টা সময় আমি ফাঁকা রাখার চেষ্টা করি। ব্যাপারটা আসলে তেমন কঠিন না কারণ বিকেলের এই সময়টায় কেউই পড়ালেখা করে না। সবাই আড্ডা দিয়ে বা টিউশানি করে সময়টা পার করে। খেলাধুলা করে বরং আরো ফ্রেশ মনে রাতে পড়তে বসা যায়।

ফুটবল খেলার সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতি?

সত্যি কথা বলতে বুয়েটে এসে আমি ফুটবল খেলাটা শিখতে পেরেছি। দেড় বছরে অনেক কিছুই পেয়েছি এখানে। মাননীয় ভিসির কাছ থেকে পুরষ্কার নিতে পারা আমার জীবনে অনেক বড় একটা অর্জন। তবে সবচেয়ে স্মরণীয় স্মৃতি হিসেবে বোধহয় বলতে হয় চট্টগ্রামের একটা টুর্নামেন্টের কথা। বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার এক সপ্তাহ কি ১০ দিন আগের কথা। একটা আন্ডারগ্রাউন্ড টুর্নামেন্টে খেলতে যাই। সেটার সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল দুটোতেই শেষ বাঁশি বাজার জাস্ট কয়েক সেকেন্ড আগে আমরা সমতা ফেরানো গোল করি খেলা পেনাল্টিতে গড়ায়। ফাইনালে শেষ কিকটা আমি নেব, গোল হলেই জয়। পরপর দুবার নিতে হল ঐ একি শট, দুবারই রেফারি রিটেক নিতে বাধ্য করলোশেষমেশ তৃতীয় বার কিক নিয়ে গোল দিয়ে দলকে জেতালাম। সেই সময়ের অনুভূতি আমি কখনোই ভুলতে পারব না।

গত ফ্যাকাল্টি কাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার অভিজ্ঞতাটা যদি বলতেন টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ভেবেছিলেন এমনটা হবে?

গত ফ্যাকাল্টি কাপে আমাদের মেকানিক্যাল ফ্যাকাল্টির টিমকে সবাই ফেভারিট হিসেবে ধরে নিয়েছিল। অসাধারণ একটা দল ছিল আমাদের। তবে সিভিলের সাথে শুরুটা হয়েছিল বাজে ভাবে। তারপর থেকে মনে হচ্ছিল এবারও বুঝি হবে না ভাগ্য বুঝি এবারও নারাজ আমাদের উপর। আর্কিটেকচারের সাথে দ্বিতীয় খেলার দিন তো নামল বৃষ্টি। মাঠে কাদা, খেলার জন্য মোটেই ভাল কন্ডিশন ছিল না। তখন দলকে ফাইনালে উঠাতে কি করতে হবে তার এত সমীকরণ মাথায় ঘুরছিল যে নিজে কি করব না করব তার কোন হিসেব ছিল না। টপ স্কোরার হওয়ার কথা তো ঘুণাক্ষরেও মাথায় আসেনি। যাই হোক, টপ স্কোরার হতে পেরেছি, আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ আমি। নিজের সামর্থ্যের উপর বিশ্বাস অনেক বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা নিজের দলের যখন প্রয়োজন ছিল, তখন দলের জন্য কিছু করতে পেরেছি এটা অনেক বড় আনন্দের ব্যাপার ছিল।

কোন পজিশনে ফুটবল খেলতে সবচেয়ে ভাল লাগে? ঐ পজিশনেই কেন?

প্রিয় পজিশন “সেন্ট্রাল এটাকিং মিডফিল্ডএ পজিশনে খেলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আর মাঠের মাঝে থেকে চারপাশে খেলা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ক্রিয়েটিভ কিছু করারও অনেক সুযোগ থাকে এ পজিশনে।

বাংলাদেশের ফুটবলে প্রাণ আনতে ভার্সিটি ফুটবল কোন অবদান রাখতে পারে কি? আপনার কি মতামত?

বাংলাদেশের ফুটবল এর উন্নতি করার জন্য আমার মতে স্কুল লেভেলে জোর দেয়ার কোন বিকল্প নেই। ভার্সিটিতে পড়ুয়া একটা ছেলে এখান থেকে খেলা শিখে প্রফেশনাল খেলতে যাবে, এটার সম্ভাবনা নিতান্তই কম। ভার্সিটিতে ফুটবল মানুষজন সময় কাটানোর জন্য বা মজার জন্য খেলে। ছোট বয়স থেকেই যদি ছেলে-মেয়েদেরকে ফুটবলের প্রতি আগ্রহী করা যেত এবং  শিক্ষাটা দেয়া যেত তাহলে আমাদের দেশের ফুটবলের চেহারাই বদলে যেত। আমি নিজেও এমন অনেককে দেখেছি যারা স্বভাবগতই অসাধারণ খেলে। কিন্তু প্রফেশনালি খেলার কথা তারা কখনো চিন্তাও করেনি বা কোন আগ্রহ নেইরাইজিং স্টার নামে যে উদ্যোগটা নেয়া হয়েছিল, সেটা খুবই ভাল একটা ব্যাপার ছিল। প্রচুর ছেলে তাতে সাড়াও দিয়েছিল তাদের মনে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল।

ফুটবল নিয়ে আপনার স্বপ্নের কথা বলুন...

ফুটবল নিয়ে স্বপ্ন দেখি যে বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ খেলবে আর আমি সেই দলের একজন অতি গুরুত্বপূর্ন খেলোয়াড়! এছাড়া বার্সেলোনা ক্লাবের হয়ে খেলাও আমার বড় একটা স্বপ্নহয়তবা এসব নিতান্তই অবাস্তব কিন্তু স্বপ্ন তো স্বপ্নই!

১০কখনও কি একবারের জন্যেও ভেবেছিলেন ফুটবলার হবেন?

কখনো...? এটা তো আমি প্রায় সময়ই ভাবি। এমনকি প্রফেশনাল লেভেলে খেলার চিন্তা ভাবনাও করি মাঝে মধ্যে। সুযোগ পেলে সে চেষ্টাও আমি করে দেখব।

১১ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ফেস্টে গান গাওয়া ও গিটার বাজানো হয়, কখনও ফুটবলের মত গান বাজনা নিয়েও ভেবেছেন?

গান-বাজনা বলতে, আমি একজন লীড গিটারিস্ট হিসেবে মিউজিকের শিক্ষা নেই। ভাল গিটারিস্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় শর্ত হল নিয়মিত অনুশীলন করা একাগ্রতা নিয়ে সাধনা করে যাওয়া। পড়ালেখার পর ফুটবল আমার প্রায়োরিটির লিস্টে সবচেয়ে উপরে তাই মিউজিক নিয়ে তেমন সিরিয়াস কোন চিন্তা ভাবনা আমার আপাতত নেইকয়েকজন বন্ধুরা মিলে একটা লাইন-আপ দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে তাদের সাথে বাজাই। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ইন্সট্রুমেন্ট এ বেশ দক্ষ তাই ওদের সাথে থেকে নিজের অনেক কিছুই শেখা হবে সাথে সংগীতের চর্চাটাও থাকবে।

১২ক্যাম্পাসের প্রায় সবাই ফুটবল আর গান বাজনার জন্যে আপনাকে চেনে ব্যপারটা কেমন লাগে আপনার কাছে?

ফুটবলের জন্য কেউ ডেকে কথা বললে অনেক ভাল লাগে। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা খেলাধুলায় অংশ নিলে হয় কি, মানুষজনের সাথে চেনা-জানা বাড়ে। অন্যরা আমাকে চেনে এটার চেয়েও বড় ব্যাপার আমি আরো বেশি মানুষকে চিনতে পারছি। এর অনেক প্রয়োজনও আছে। অনেক ভাল মানুষ, মজার মানুষ, সিনিয়র- যাদের সাথে আমার হয়ত পরিচিত হওয়ার কোন কথাই ছিল না এমনকি অনেক প্রফেসর এর সাথেও পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। ব্যাপারটা অনেক উপভোগ করি

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

More news