তিতাস আহমেদ: গুগলে বাংলা ভাষার তরুণ যোদ্ধা



জনসংখ্যার দিক থেকে হিসেব করা হলে বাংলা ভাষা পৃথিবীর ৭ম স্থানে অবস্থান করছে। কিন্তু কম্পিউটিং জগতে খুব একটা ভালো অবস্থান করে নিতে পারেনি আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং থেকে শুরু করে অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন (OCR), টেক্সট টু স্পিচ অথবা স্পিচ টু টেক্সট নিয়ে কাজ করে বাংলাকে কম্পিউটিং বান্ধব করার স্বপ্ন নিয়ে যে কজন তরুণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে “তিতাস আহমেদ” অন্যতম।

তিতাস এরই মধ্যে তার কাজের অবদান স্বরূপ ‘GDG Bangla (Google Developers Group Bangla)র বাংলাদেশের প্রথম ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিতাস আহমেদ পড়েছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। বিডি ইয়ুথের সাথে এক আড্ডায় তিতাস জানান বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে তার স্বপ্ন আর সম্ভাবনার কথা

“আমি আর আমার বন্ধু মতিউর রহমান কিছুটা শখের বশেই ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার শব্দের অনুবাদ শুরু করেছিলাম। তারপর আমরা ঠিক করলাম এটা মানুষকে জানানো উচিত। তাই সোশ্যাল নেটওয়ার্কগুলোতে আমরা মানুষকে বাংলা শব্দ অনুবাদের জন্য আহবান জানানো শুরু করি।”

“এটার ভবিষ্যৎ কি হবে সে সম্পর্কে আমাদের মাথায় তখন কিছুই ছিল না। শুধু জানতাম প্রাণের বাংলা ভাষার জন্য কিছু একটা করছি। এরপর আমাদের অবাক করে দিয়ে অনেক মানুষ এগিয়ে আসে, যা ছিল আমাদের কল্পনার বাইরে!!

দেশ এবং বিদেশ থেকে ফেসবুকসহ সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটগুলোতে প্রায় ৩০০০ মানুষ আমাদের সাথে কাজ করেছিল যার মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকেই ছিল প্রায় ১৪০০ জনের মত শিক্ষার্থী।”

বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে শুরুর দিকের গল্প বলছিলেন তিতাস। এবার তিতাসের বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে শুনবো তার অর্জনের গল্প, সফলতার গল্প

GDG Bangla (Google Developers Group Bangla)’তে আমরা মূলত বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করি। বাংলা ভাষাকে ইন্টারনেটে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য ২৬শে মার্চ ২০১৫’তে আমরা “বাংলার জন্য ৪ লাখ” প্রোগ্রামের আয়োজন করেছিলাম। Google এর হিসেব মতে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার শব্দ অনুবাদের সব রেকর্ড ভঙ্গ করি আমরা!!”

GDG Bangla আমি আর আমার বন্ধু মতিউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর হিসেবে মনোনীত করে। এটা ছিল আমার জীবনের একটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন।”

বর্তমান কর্মকাণ্ডগুলো নিয়ে জানতে চাইলে তিতাস বলেন, “এখন আমরা GDG Bangla’র বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে বেশ কিছু রিসার্চ এবং ডেভেলপিং এর কাজ করে যাচ্ছি। এছাড়া বর্তমানে আমি IEEE এবং Rotary International এর কিছু প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ করছি ‘GDG Bangla’র মূএবং বধিরদের নিয়ে একটা প্রোজেক্ট ছাড়াও একটি ‘লার্নিং প্ল্যাটফর্ম’ নিয়ে কাজ করছিএই সবগুলো প্রোজেক্টের সাথেই কোন না কোনভাবে যুক্ত আছি।”

বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কে ছিলেন, এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তিতাস বলেন, “রোল মডেল হিসেবে যদি বলতেই হয় তাহলে প্রথমেই বলতে হবে, Google Developers Group Bangla’র Community Manager জাবেদ সুলতান পিয়াস ভাইয়া আর BDSON’ এর General Secretary মুনির হাসান স্যারের নাম।”

এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাস রেখেই এগিয়ে যাচ্ছেন স্বপ্নবাজ তিতাস আহমেদ এবং তার কম্পিউটিং জগৎ

“পৃথিবীতে তোমার কাছে সব থেকে প্রিয় জিনিস তুমিই তোমাকে তোমাতেই প্রাধান্য দিতে হবে তবে অন্য কিছুকে ছোট না করে পারিপার্শ্বিক সব কিছু আপনাতেই ঠিক হবে

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তবে কি?? জানতে চাইলে তিতাসের উত্তর, “মৌখিক ভাষা হিসেবে বাংলা পৃথিবীর ৭ম বৃহৎ ভাষা হলেও কম্পিউটিং জগতে বাংলার অবস্থান খুব বেশি সন্তোষজনক নয়। কিন্তু বাংলা কম্পিউটিংকে এগিয়ে নেয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আগামী ২ বছরের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণের জন্যই কাজ করে যাবো আমি।”

অবসর কাটানোর প্রসঙ্গ উঠলে তিতাস বলেন, “অনেকে অবসরে বই পড়ে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। কিন্তু আমার কাছে বই পড়া আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া অনেক বড় কাজ মনে হয়। দুটি ক্ষেত্রেই মনোযোগ ধরে রাখার ব্যাপার আছে। মানে এসবকে অবসর সময়ের কাজ মনে করতে পারি না, কাজই মনে হয়। তবে যখন একেবারেই কোন কাজ থাকে না, তখন আমি একাই রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করি!! ভালা লাগে এমনটা করতে।”
নওগাঁ’র ছেলে তিতাস নওগাঁ জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং নওগাঁ গভঃ কলেজ থেকে এইস.এস.সির গণ্ডি পার করে ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে।

জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে তিতাসের সাফ কথা, “প্রথমত একজন ভাল মানুষ হতে চাই। দ্বিতীয়ত, বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করে যাওয়া, মানে বাংলা ভাষায় কম্পিউটিং প্রক্রিয়াকে আরও বেশি উপযোগী করে তোলা। তৃতীয়ত, আমার স্বেচ্ছায় কাজ করা খুব বেশি টানে তারপরও সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকবার জন্য যেটুকু করার দরকার আমি করবো। আমি জীবিকার কথা বলছি! খুব বেশি চাহিদা নেই, তবে একঘেয়েমি কিছু করার লক্ষ্যও কিন্তু নেই!!”

এছাড়া ২৬শে মার্চ GOOGLE এর বর্তমান CEO সুন্দর পিচাই আমাদের “বাংলার জন্য ৪ লাখ” শীর্ষক প্রোগ্রামের মূল উদ্দ্যেশ্য আগত সব দেশের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরার মুহূর্তটুকুও ছিলো আমার জীবনের একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। এছাড়া এবারের IGEN 15 ক্যাম্পের অভিজ্ঞতাও ছিল অনেক মজার।”
এসব কাজের মাঝে মজার কিংবা স্মরণীয় ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিতাস জানান, “
GDG Bangla এর Community Manager জাবেদ সুলতান পিয়াস ভাইয়া যখন ঘোষণা করলেন আমি আর মতিউর বাংলাদেশের প্রথম GDG Bangla’র ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর, তখনকার মুহূর্তটা ছিল আমার জীবনের এক অসাধারণ মুহূর্ত।

“এছাড়াও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’র কম্পিউটার বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগের প্রধান সৈয়দ আখতার হোসেন স্যার, GDG’Communication Manager রাহিতুল ইসলাম ভাইয়া আমাদের বিভিন্ন সময় উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং করছেন

তাদের কাছে থেকে কিভাবে, কেমন অনুপ্রেরণা পাই তা বলতে গেলে ৬-৭ পাতা লিখে ফেলা যাবে!! কারণ কাজগুলো শুরু করার সময় থেকেই তারা আমাদের পথ প্রদর্শক এবং অভিভাবক হিসেবে ছিলেন এবং আছেন।”

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


More news