বুয়েটের গণিতপ্রেমী কামরুল: ঘুরতে চান পৃথিবীর পথে



কামরুজ্জামান কামরুল, বুয়েট প্রকৌশল’০৮ ব্যাচের ছাত্র। কাজ করেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের হয়ে। প্রচণ্ড ঘোরাঘুরির শখ। শুধু শখ বললে ভুল হবে, তার মন মাথায় একটাই কথা ঘোরে- ‘যাই যাই, কোথাও ঘুরতে যাই’!! এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঊনষাটটা জেলা তার ঘোরা হয়ে গেছে।

তার গণিত অলিম্পিয়াডের হয়ে কাজ করা আর ঘোরাঘুরির গল্প শুনিয়ে পাঠকদের মাথা ঘুরিয়ে দেবার জন্য বিডি ইয়ুথ দেবে কামরুজ্জামান কামরুলের সাথে আড্ডা!!

বিডি ইয়ুথ: বুয়েটে পড়ছেন। এই ইচ্ছেটা নিজের নাকি কোন মানুষ বা কোন কিছু অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে?

হুম্, ইচ্ছেটা আসলে ছোটবেলা থেকেই ছিল। সম্ভবত সেভেন কি এইট থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পারলে বুয়েটেই পড়বো। শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো, এমনটাও না। বুয়েটেই পড়তে হবে, এ রকম একটা ‘বায়াসড!’ চিন্তা কাজ করেছে আসলে।

আমার লাইফে খুব ইন্সপায়ারিং মানুষজনদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আমার বড় ভাই। ভাইয়া বুয়েটে ভর্তি হবার পরে আমি তাকে দেখতাম বছরে নয় মাস ঘুমায়, দুই মাস ঘুরে আর এক মাস পড়ে। এতো কিছুর পরে মানুষজন আবার যখন শোনে, ও বুয়েটে পড়ে ভালো করছে। তখন বেশ একটা ভাবও নেয়া যায়!! তখন মনে হতো, এই জায়গাটাতে আসা গেলে মন্দ হয় না।

একটু বড় হবার পরে দেখি, আশেপাশের যত সুপার কুল টাইপের লোকজন সব বুয়েটে পড়ে। সোহাগ ভাই, চমক ভাই, সুব্রতদা, এদেরকে দেখে মনে হয়েছে, এই জায়গাটাতে আসতেই হবে। সবগুলো অসাধারণ মানুষ যখন একটা প্ল্যাটফর্মে থাকে, তখন নিশ্চয়ই সেখানে এমন কিছু না কিছু আছে যা আরাধ্য হওয়া উচিত সবার জন্যই।

বিডি ইয়ুথ: বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের সাথে আপনি জড়িত, কিভাবে দেখেন ব্যাপারটা? কেমন অনুভূতি কাজ করে?


আমি যে সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত, তার মধ্যে সবচাইতে প্রিয় অর্গানাইজেশন ‘বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড’। প্রথম অংশগ্রহণ করেছি এইচএসসি’র ফার্স্ট ইয়ারে, কিচ্ছু পারি নাই। পরেরবার জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছিলাম, একটা পুরষ্কারও জুটিয়েছিলাম। খুব আশা ছিল ক্যাম্পে যাবো, কিন্তু ডাকা হয়নি আমাকে।

গণিতের প্রতি অন্যরকম একটা ভালো লাগা ছিলো। ভালোলাগাটা অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল একটা বইয়ের কারণে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার এবং কায়কোবাদ স্যারের লেখা “নিউরনে অনুরণন”। আমার চিন্তা ভাবনা আমূল পালটে গিয়েছিল এই বইটা পড়ে।

এইচ.এস.সি পরীক্ষার পরে সুব্রতদার হাত ধরে গণিত অলিম্পিয়াডে আসা। তখন থেকে এখন পর্যন্ত আছি। ঘাড় ধরে বের করে না দিলে, গণিত অলিম্পিয়াড ছেড়ে যাবার এখনও পর্যন্ত কোনো সম্ভবনা দেখি না!

আমি মাঝেমাঝেই একটা কথা বলি। আমি মানুষটা আজকে যে রকম আছি, এর মধ্যে মৌলিক কিছু নেই। আমি অনেকের কাছে থেকে অনেক কিছু শিখেছি, ধার করেছি, অনুকরণ করেছি, কিছু ক্ষেত্রে স্থূলভাবে নকল করেছি। আমার এই বিবর্তনের পেছনে আছে কিছু অসাধারণ মানুষ। যাদেরকে দেখে আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি, ‘চাইলেই সম্ভব’। অসম্ভব কিছু জ্ঞানী, ভালো মানুষ, পরোপকারী এবং দুর্দান্ত প্রতিভার সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে এখানে এসে।

বিডিএমও’ একাডেমিক টিম পুরোটা একটা সিঙ্গেল ইউনিট। এখানে সবার মধ্যে অদ্ভুত একটা বন্ধুত্ব আছে। ২০০০ ব্যাচের সোহাগ ভাই, সুবীন ভাই থেকে শুরু করে ২০১৫ ব্যাচের পিচ্চিপাচ্চা পর্যন্ত সবাই এই জায়গাটাতে আসলে একরকম হয়ে যায়।

বকবক চলে অফুরন্ত!! এর চাইতে প্রাণচাঞ্চল্যকর আর কোন কিছুই পৃথিবীতে নেই, এটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি। এর প্রত্যেকটা কোর মেম্বার এক একটা লিজেন্ড। এক একজন যার যার স্থানে ‘বস’।


প্রথমদিকে গণিত অলিম্পিয়াডে যেতাম অনেক বড় বড় চিন্তা করে। দেশের কাজ করছি, শিক্ষা ক্ষেত্রে খুব সামান্য হলেও পরিবর্তনসূচক কাজ হচ্ছে, বাচ্চাদেরকে ইন্সপায়ার করতে পারছি, এ রকম খুচরো অসংখ্য চিন্তা কাজ করতো। কিন্তু এখন ব্যাপারটা আমার ভয়ঙ্কর নেশা আর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। আগের সব চিন্তা চলে গেছে, গণিত অলিম্পিয়াড ছাড়া আমি আমার জীবন এখন চিন্তাও করতে পারি না।

আগে অনেক কিছু ভেবে গণিত অলিম্পিয়াডে গিয়েছি। এখন কারণ একটাই, খুব বেশি ভাল লাগে। সকালবেলা ভেন্যুতে বাচ্চাদেরকে ঘুরতে দেখলে ভাল্লাগে, একসাথে লাইনে দাড়াতে দেখলে ভাল্লাগে, পিচ্চিদেরকে কলম কামড়াতে কামড়াতে প্রশ্নের সাথে যুদ্ধ করতে দেখলে ভাল্লাগে, প্রশ্ন করতে দেখলে ভাল্লাগে।

চমক ভাইয়ের গণিতের গান শুনলে এখনো আমার লাফাতে ইচ্ছে করে।

একসাথে দাঁড়িয়ে “আমরা করবো জয়” গাইলে চোখে পানি চলে আসে!!

বিডি ইয়ুথ: আপনি তো অনেক ঘোরাঘুরি করেন। এজন্য তো মোটামুটি বিখ্যাত হয়ে গেছেন, ঘোরাঘুরির এই শখটা কখন থেকে?

আমি বিনয়ের সাথে বলতে চাই, আমি অনেক ঘোরাঘুরি করি না!!

আমি বাংলাদেশের খুব কম জায়গাতেই গিয়েছি। জেলাভিত্তিক তালিকা করলে সংখ্যাটা বেশ বড় শোনায়, ৫৯টি। তার মধ্যে বড়সড় একটা অংশে যাওয়া হয়েছে গণিত অলিম্পিয়াডের জন্য। আর বাকিগুলোতে ছোটখাটো কাজে-কর্মে কিংবা ঘুরতে।

আমার কলেজ লাইফের একটা বিশাল সময় গেছে মিরপুর বেড়িবাঁধে। আমি আর আমার বন্ধু এরিক, শহীদুল, রানা, আমিন... আমাদের মধ্যে যে যখন ফ্রি থাকতো, চলে যেতাম বেড়িবাঁধে। নদীর ধারে বসে গল্প করতাম, আড্ডা দিতাম মন খুলে, গান গাইতাম, তারপরে সন্ধ্যা হলে ফিরতি পথ ধরতাম। মনটা আইঢাই করলে যাবার দৌড় ছিলো অতদূরই।

মনে হতো, যদি এই আড্ডাটা নদী না হয়ে সমুদ্রের সামনে হতো, যদি সামনের এই বালিয়াড়িটা পাহাড় হতো!! ইচ্ছাটা সম্ভবত সেখান থেকেই লম্বা চওড়া হতে শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরে সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার সুযোগ আসে সামনে।

বিডি ইয়ুথ: কোথায় কোথায় ঘুরলেন এখন পর্যন্ত?


 

ঘোরাঘুরির শখটা আগে থেকেই ছিলো, সাধ্য ছিলো না। একদম ছোটবেলায় সিলেট গিয়েছিলাম আব্বুর সাথে, আর এরপরে ছোটখাটো বেশ কিছু ঘোরাঘুরি হলেও সেটা বড় কিছু ছিল না। কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী এগুলোতে গিয়েছিলাম আত্মীয়-স্বজনদের সুবাদে।

এর আগে স্কুলে থাকার সময় এসএসসি পরীক্ষার পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। কলেজে এইচ.এস.সি পরীক্ষার পরে গিয়েছিলাম সিলেটে। এছাড়া আর তেমন কোথাও যাওয়া হয়নি।

ভার্সিটিতে ওঠার পর থেকে আসলে স্বাধীনতাটা পাই, যখন যেখানে খুশি যাবার। প্রথম শুরুটা সোহাগ ভাই, লিটন ভাইয়ের সাথে। জামালপুর, ফরিদপুরে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের কাজে। এরপরে নাটোরও গিয়েছিলাম একই ধারাবাহিকতায়।

ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হবার আগে প্রথম সবান্ধব নিজেদের পরিকল্পনাতে ঘুরতে যাওয়া, কক্সবাজারে। এরপরে থেকেই জোরেসোরে শুরু হলো ঘুরাঘুরি। প্রথম টার্ম ফাইনাল ব্রেকে দিনাজপুর গিয়েছিলাম ক্লাসমেটরা মিলে। আমাদের জন্য সেটা ছিলো এক অর্জন। পুরোপুরি অজানা একটা জায়গাতে যাবো, সেখানে থাকবো, ঘুরে বেড়াবো! ভীষণ এক উত্তেজনা কাজ করেছিল তখন। তারপরে আস্তে আস্তে অন্যান্য স্থানে যাওয়া শুরু।

দিনাজপুরের পরে নেত্রকোনা, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান। দেশের বাইরেও গিয়েছি- নেপালে ২০১৩’তে দুইবার, ২০১৪’তে একবার। সেখানে অন্নপূর্ণা বেইজ ক্যাম্প আর ল্যাংট্যাং ট্রেক এ গিয়েছি।

ফাঁক তালে ছোটখাটো অনেক ঘোরা হয়েছে গণিত অলিম্পিয়াড আর বন্ধুবান্ধবদের বাড়িতে দাওয়াত কিংবা অন্যান্য কাজে-কর্মে। যখনই যেখানে গিয়েছি, চেষ্টা করেছি আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে। মেইনস্ট্রিম ঘোরাঘুরির সাথে চেষ্টা করেছি অবসরে ঘুরে বেড়াতে, দেখে বেড়াতে চারপাশ।

বিডি ইয়ুথ: এই পরিব্রাজক জীবনে কোন মজার ঘটনা আছে কি? কোন এক ট্যুরে অপ্রত্যাশিত কিছু হয়েছে কখনও?


প্রত্যেকটা ভ্রমণেই আসলে অসংখ্য মজার মজার স্মৃতি থাকে। তার মধ্যে টুকরো দুটো ঘটনা বলি-

২০১৩ সালে আমরা বান্দরবান গিয়েছিলাম রাইক্ষ্যং লেক যাবো বলে। বগালেকের দিকে হাঁটা শুরু করবার পরে সবার খেয়াল হলো, পুরো একদিনের রাস্তা!! কেউ সাথে করে কোন শুকনা খাবার আনিনি। গাইড সাদেক ভাই বললো, “সাইকট পাড়াতে দোকান আছে একটা, সেখান থেকে নেয়া যাবে।”

সাইকট পাড়াতে পৌছে দেখি দোকান বন্ধ, বারোটার বেশি বাজে তখন। সকাল থেকে হাঁটতে হাঁটতে এরমধ্যেই সবার পেট চোঁ চোঁ করছে, কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। কাজেই খালি পেটেই হাঁটা দিলাম।

আমরা মোট আটজন, কিছুক্ষণ পরে সবার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেলো। ক্ষুধার চোটে সবাই কাহিল। রুমা খাল ক্রস করার পরে হঠাৎ করেই দেখি, মাঠিতে লাল লাল কি যেন পড়ে আছে!! আবিষ্কার করা গেলো, এটা জাম।

আনন্দে বগল বাজাতে বাজাতে সাদেক ভাই গাছে উঠে প্রথমেই এক কোঁচড় আগে নিজে খেয়ে নিলো। তারপরে মোটামুটি কেজি দুয়েক জাম পেড়ে নিয়ে এলো গাছ থেকে। প্রায় কাঁচা সে জামই বীচিসহ কি যে বুভুক্ষুর মত খেয়েছিলাম সেবার, মনে পড়লেই হেসে উঠি।


 

আরেকটা অভিজ্ঞতা বেশ সদ্য-

আমার ট্র্যাভেলিং গুরুদের একজন হলেন রাব্বি ভাই। গাত্রবর্ণ প্রায় আলকাতরার মত বলে আমরা উনাকে আদর করে “ঘানার রাজপুত্র” বলে থাকি।

রাব্বি ভাই তার ট্র্যাভেলিং এর ব্যাপারে প্রচণ্ড প্যাশনেট। জাস্ট পানিতে ভাসতে ভালোবাসেন বলে উনি আস্ত একটা জেমিনি বোট কিনে ফেলেছেন। গত বছর আমরা সেন্টমার্টিন গিয়েছি ক্যাম্পিংয়ে। সাথে করে একশ কেজি ওজনের সেই বোটও টেনে নিয়ে গিয়েছি চালাবো বলে।

সেন্টমার্টিন গিয়ে আবিষ্কার করা গেলো, একশ কেজি বোট আমরা ঠিকই এনেছি তবে দুই কেজির মোট চারটা বৈঠা আনা হয়নি!! কপালকে কিছুক্ষণ গালমন্দ করে শেষমেষ তক্তা কেটে দুইটা বৈঠা বানানো হলো। প্রচণ্ড ভারী আর ধরা যায় না ঠিকঠাক, তারপরেও নৌকা তো চালাতেই হবে।

সেই নৌকা পানিতে ভাসিয়ে আমরা ছেঁড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নৌকাতে আমরা মোট ছয়জন। প্রথমদিকে বেশ ভালোই ভেসে আসলাম কিছুটা। কারণ সাথে একটা বাঁশ ছিলো, সেটাকে লগি হিসেবে ব্যবহার করে বেশ অনেকদূর চলে আসা গেছে।

সমস্যাটা হলো একটু গভীর পানিতে এসে। লগি তো ঠাঁই পায় না। বৈঠা যতই জোরে চালাই, নৌকাও আগায় না। তার উপরে ভাটা শেষ হয়ে জোয়ার শুরু হচ্ছে, নৌকা শুধু পাড়ে গিয়ে ঠেকতে চায়। আগায় না!


 

বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা নৌকা চালিয়ে বোধ হয় এক কিলোমিটার এগোতে পেরেছিলাম। মাঝখানে অপু আর লিপু ভাই কিছুক্ষণ পানিতে নেমে হিউম্যান ইঞ্জিন হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। নৌকা পঞ্চাশ মিটার পিছিয়েছে, লাভ হয়নি!! অবস্থা বেগতিক দেখে রাব্বি ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন, পাল খাটাবেন। প্রচণ্ড বাতাস, ঠিকঠাক ব্যবহার করা গেলে নিমিষেই পৌছে যাবার কথা।

পাল তো নাই, কি করা যাবে? কাজেই ব্যাগ থেকে হ্যামক বের করে সেটার দড়ি খুলে লম্বা করে বাঁশের মাথায় বেঁধে পাল বানিয়ে ফেলা হলো। একটু পরে আবারো বিপদ, পালের বাতাস লেগে নৌকা প্রায় পাড়ে চলে এসেছে। আরেকটু হলেই ধারালো প্রবালের উপরে পড়ে রীতিমত ছিঁড়ে খুঁড়ে যাবে। ব্যাপক গিয়ারে বৈঠা টেনে আবারো দূরে সরে এলাম। পাল নামিয়ে ফেলা হলো।

সেই দীর্ঘরাতের কথা আসলে বলে শেষ করা যাবে না। রাত আটটা পর্যন্ত নৌকাতে বৈঠা চালিয়ে কয়েক হাজার বার নৌকাটাকে কোনোমতে উলটানো থেকে রক্ষা করে, শেষমেষ আমরা সেন্টমার্টিনের শেষ মাথায় এসে পৌছুলাম সাড়ে আটটার দিকে। ততক্ষণে কারো গায়ে এক ফোঁটা শক্তি নেই। সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ছেঁড়া দ্বীপ পরে দেখা যাবে, আজ রাতে এখান থেকে কেউ নড়ছি না।

এই দিকে আরেক বিপদ, আমাদের সাথে আরো তিনজন ছিল। যারা পায়ে হেঁটে ছেঁড়া  দ্বীপ চলে গিয়েছে, একসাথে ক্যাম্প করবো বলে। আমাদের দেরি দেখে প্রথমে আমাদেরকে ফোন, তারপরে ঢাকাতে ফোন। তারপরে নিজেদের মাঝখানে শলা পরামর্শ করে ফোন দিয়েছে সেন্টমার্টিনের কোস্ট গার্ডে। আমরা খোলা সাগরে ভেসে গেছি এমনটা ভেবে!!

সেই রাত সাড়ে আটটার সময় মাত্র নৌকা টেনে বালিতে তুলে অবসন্ন শরীরে বালুতে শুয়ে আছি। এমন সময় টের পেলাম, কোস্ট গার্ডের স্পীড বোট আসছে আমাদের খোঁজ পেয়ে। আমাদের আজকে খবরই আছে!! দিন একটা কাটিয়েছিলাম বটে!!

বিডি ইয়ুথ: এত ঘোরাঘুরি করেন, এখানে বিপদের ঝুঁকিটাও তাহলে থাকছে?


এটা খুবই আশ্চর্যের একটা ব্যাপার। দু’একবার অপ্রীতিকর ঘটনা, মানে কারও সাথে বাদানুবাদ ছাড়া আমি কখনই কোন বিপদে পড়িনি। আমার কাছে মনে হয়, কিছু গ্রামার, কিছু বেসিক ফলো করলে, ঝুঁকির পরিমাণ কমে প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

এমনিতে প্রায় সবজায়গাতেই মানুষজন প্রচণ্ড সাহায্য করে। বিপদে পড়ে সাহায্য চেয়ে কখনো ফিরতে হয়নি কোথাও থেকে। তবে দু'একজন সুযোগ সন্ধানী সব জায়গাতেই থাকে, যাদের কথা মাথায় রেখে একটু সাবধান থাকলেই হলো।

বিডি ইয়ুথ: একটু অন্যদিকে যাই। এত ঘোরাঘুরি করেন, এতে আপনার কোন দর্শন কাজ করে?

আমার দর্শন খুবই সোজাসাপ্টা! আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীটা অনেক বড়, দেখবার অনেক কিছু আছে, শিখবার কিছু আছে। প্রত্যেকটা মানুষ, প্রত্যেকটা রাস্তা, প্রত্যেকটা শহর এক একটা দর্শন এবং জ্ঞানের ভাণ্ডার হতে পারে। খুব অল্প সময়ের জন্য আমি পৃথিবীতে এসেছি। আমি চাই, যতটুকু পারি এর রূপ দেখে যেতে এবং জীবনের দর্শনটা শিখে যেতে।

যথোপযুক্ত সম্মান রেখে, কারও কোন ক্ষতি না করে, পৃথিবীটা ঘুরে বেড়াতে পারলে আর কিছু আসলে চাইবার নেই। কোথাও পড়েছিলাম, “মৃত্যুর আগে তোমার সামনে তোমার পুরো জীবনটা চলচ্চিত্রে মত ভেসে উঠবে।”

আমি চাই, আমি আমার সেই চলচ্চিত্র দেখে বলতে পারি, হেব্বি হইসে!!

বিডি ইয়ুথ: কোন জায়গাগুলো বেশি টানে? পাহাড়, বরফ না সমুদ্র?


 

তাহলে আমার উত্তরটা হবে, স্নো ক্যাপড মাউন্টেইন! পাহাড় বরফ দুটোই আছে!

বিডি ইয়ুথ: এমন কোন জায়গার কথা বলেন যেখানে অবশ্যই আপনি ঘুরে আসতে চান, আর এমনটা হওয়ার কারণই বা কি?

ইউরোপ ঘুরতে চাই। মূলত সংস্কৃতির কারণে। অসংখ্য বই পড়ে, মুভি দেখে, রীতিমত লোভ লাগে সামনা সামনি দেখবার জন্য। অরোরা বোরিয়ালিস(সৌরজগতের আলোর খেলা ‘নর্দার্ন লাইটস’) দেখতে চাই, যেখান থেকে পারি।

বিডি ইয়ুথ: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

পেশাগত জীবনে জড়িয়ে যাবার ইচ্ছে নেই এখনোও। বন্ধুরা মিলে আমরা আমাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে কিছু কাজকর্ম করি, সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার ইচ্ছা আছে। জীবিকা নির্বাহের পেছনে ন্যূন সময় ব্যয় করে, বাকিটুকু সময় সর্বোচ্চ উপভোগ করতে চাই। পাশাপাশি এক্সট্রিম স্পোর্টস ইন্ট্রোডিউস করার একটা পরিকল্পনা আছে। সেটা নিয়েও শুরু করার ইচ্ছা দু'এক বছরের মধ্যে।

এর বাইরে আরো কিছু চিন্তা আছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা একটা সময় অনেকগুলো পরিকল্পনা করেছিলাম। সংস্কার, পরিমার্জন ইত্যাদি। সেটা নিয়ে জোরেসোরে কাজ করবো। গণিত অলিম্পিয়াড সহ অন্যান্য প্রিয় জায়গাগুলোতে প্রত্যক্ষ অবদান রাখতে চাই। প্রচুর বই পড়তে, নতুন কিছু শিখতে, নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হতে চাই।

অনেকগুলো বই লেখার ইচ্ছাও আছে। আর আজীবন ঘুরতে চাই, উড়তে চাই!!

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি        

  

More news