সালমান শাহঃ দাঁড়িয়াপাড়া থেকে পুরো বাংলাদেশ



আমি বড় হয়ে হব ঋত্বিক! আর আমি? আমি হব  প্যাটিনসন!

কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন পাশের বাড়ির ডানপিটে ছেলেটি থেকে ক্লাসের শান্ত ছেলেটিও হতে চাইত সালমান শাহ! হুট করেই সিলেটের দাঁড়িয়াপাড়ার মেঘনা-২১ নাম্বার বাসার ছোট্ট ইমন জয় করে ফেলেছিল বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষের হৃদয় হয়ে উঠেছিল সালমান শাহতেমনি হঠাৎ করে  হারিয়েও গিয়েছিল দর্শকদের জীবন থেকে। সালমান শাহ এর আত্মহত্যা আজও রহস্য হয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে

ইমন, যে বাংলাদেশের একজন সুপারস্টার হয়ে উঠতে পারে, তা কেউ কোনদিন কল্পনাও করে নি , সে নিজেও নাছোটবেলা থেকে দারুণ চঞ্চল আর ডানপিটে ছিল ইমন। পাইলট হয়ে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ানোই ছিল তার স্বপ্ন১৯৭১ সালে ১৯ শে সেপ্টেম্বর নানাবাড়ি সিলেটে জন্ম গ্রহণ করে ইমন।

সিলেটে জন্ম নিলেও ঢাকায় জীবনের অধিকাংশ সময় কাটে তারপড়েছেন ঢাকার ধানমণ্ডির আরব মিশন স্কুলে এবং আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজে। পরে মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন। কৈশোর বয়সে ব্যাট-বলের প্রতি আকর্ষণ ছিল বেশি। তারপর আকর্ষণ বাড়তে থাকে অভিনয় আর মিউজিকের প্রতি।

সঙ্গে ছিল নতুন নতুন ফ্যাশন আর স্টাইলকে ধারণ করার প্রবণতা। আগ্রহ আর স্টাইলিশ মনোভাব তাঁকে নিয়ে আসে মডেলিংয়ে। ১৯৮৬ সালে হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান “কথার কথা” তে মিউজিক ভিডিও ও বেশি কিছু বিজ্ঞাপন চিত্রে অভিনয় জীবন শুরু হয় তবে নাম কুড়িয়েছেন ছোট পর্দায় আব্দুল্লাহ আল মামুনেরপাথরনাটকে একটি ছোট্ট রোলের মাধ্যমে

১৯৯৩ সালে আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটিডের পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান তার নতুন ছবি কেয়ামত থেকে কেয়ামতের জন্য নতুন মুখ খুঁজছিলেন। এই সিনেমাটি হিন্দি সিনেমা থেকে কপিরাইট কেনা হয়েছিল বলে এমন অভিনেতা খুঁজছিলেন যে মুল সিনেমার নায়ককে ফুটিয়ে তুলতে পারে পর্দায়। হঠাৎ খোঁজ পেলেন স্বল্প পরিচিত এক মডেলের। ডেকে নিয়ে এলেন অফিসে, সব কিছু দেখে শুনে যাচাই করলেন ছবির নায়ককে। কিন্তু মডেলের “ইমন” নাম কিছুতেই সন্তুষ্ট করছিল না প্রয়োজক গোষ্ঠীকে, নতুন ছবির নায়ককে তাঁরা নাম দিলেন “সালমান শাহ”

সেই শুরু। কেয়ামত থেকে কেয়ামত সুপার হিট করল বাংলাদেশে। তখনকার অনেক তরুণদের পরনে থাকত ছেড়া জিন্স, কেউ বা মাথায় বাঁধত রুমাল আর  মুখে থাকত গুনগুন করে গান “ ও আমার বন্ধুগো! ” ডান হাতে ঘড়ি পড়ার চলও সেই সময় থেকে শুরু। সেই চল আজও অনেক নায়কের মাঝে দেখা যায়। স্টাইলিশ আইকন বলতে যা বুঝায় সালমান শাহ ছিল তাই।

সালমান-মৌসুমি জুটি তখন ক্রেজ ছিল মানুষের কাছে। ৯০ দশকের দিকে, বিশেষ করে জাফর ইকবালের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের চলচিত্র হয়ে পড়ে জীর্ণ, ফ্যাকাসে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারী-পুরুষ হলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সালমান শাহ তাদের ফিরিয়ে আনেনমাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে ২৭টা ছবির নায়ককে দেশের মানুষ এত তাড়াতাড়ি আপন করে নিয়েছিল যা আর অন্য কোন নায়কের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি।

চলচ্চিত্রে আসার কিছুদিন পরেই ভালবেসে বিয়ে করেন সামিরাকে। কিন্তু তার আত্মহত্যার পরে শুনা যায় স্ত্রীর সঙ্গে তার টানাপোড়েন চলছিল শেষের দিকে। প্রযোজকদের সঙ্গেও ছিল বোঝাপড়ার অভাব। চলচ্চিত্র পরিচালক মতিন রহমানকে সালমান বাবা বলে ডাকতেন। মৃত্যুর আগের দিন সালমান শাহ তাকে বলেছিলেন “বাবা আমি ভাল হয়ে গেছি। কাল থেকে আর কাউকে কষ্ট দিবে না। তোমাদের চেষ্টায় আজ আমি ইমন থেকে সালমান। আগামীকালের সকাল হবে সবার জন্য প্রিয় সকাল

পরদিন ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর সালমানের ইস্কাটনের বাসায় তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ডাক্তাররা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন সালমানের মৃত্যুর খবর ছিল আকস্মিক। না পরিবার, না  বন্ধুবান্ধব, না লাখো দর্শক কেউ প্রথমে মেনে নিতে পারেনি সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। দেশের বেশ কয়েকটি জায়গায় এই খবর শুনে ২১ টি তরুণীর আত্মহত্যার খবরও আসে। দুই দুইবার ময়না তদন্তের পর আত্মহত্যার ব্যাপারটি নিশ্চিন্ত হয়। তবুও আজও তার ভক্তরা মেনে নিতে পারে না এই আত্নহত্যাকে।

বলিউডে সস্ত্রীক সালমান শাহ দেখা করেছিলেন শাহরুখ খানের সঙ্গে। শাহরুখ খান তখনও আজকের “বলিউডের কিং খান” না স্ত্রী গৌরীকে ডেকে পরিচয় করিয়ে দেন “ দেখ গৌরী, ইনি সালমান শাহ, বাংলাদেশের সিনেমার কাণ্ডারি”। এ কথা সত্যি যে, সালমান শাহ এর পরে বাংলাদেশের সিনেমাতে আর কোন ক্রেজ আসে নি, তার আগে পরে আর কোন নায়কের ফ্যাশন বা স্টাইল তরুণরা ফলো করেনি।

সালমান বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির পথটা হয়ত আরও মসৃণ হত। সালমানের মৃত্যুতে একজন মেধাবী অভিনেতাকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। আর কোন নায়ক কি সালমান শাহ এর মত হতে পারবে? তা হয়ত সময় বলে দিবে। কিন্তু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হৃদয়ে সেই  দাঁতে নখ কামড়ান কিংবা মাথায় রুমাল বেঁধে বাইক ছুটিয়ে চলা যুবক বেঁচে থাকবেন আজীবন

এক নজরে সালমান শাহ এর ছবি সমূহ:

                 সাল

               মুভির নাম

১৯৯৩

কেয়ামত থেকে কেয়ামত

১৯৯৪

প্রেমযুদ্ধ

তুমি আমার

বিক্ষোভ

স্নেহ

অন্তরে অন্তরে

সুজন সখি

১৯৯৫

আশা ভালোবাসা

স্বপ্নের ঠিকানা

আঞ্জুমান

মহামিলন

দেনমোহর

কন্যাদান

 

১৯৯৬

মায়ের অধিকার

বিচার হবে

প্রিয়জন

জীবন সংসার

তোমাকে চাই

এই ঘর এই সংসার

চাওয়া থেকে পাওয়া

সত্যের মৃত্যু নেই

স্বপ্নের পৃথিবী

 

১৯৯৭

শুধু তুমি

বুকের ভেতর আগুন)

আনন্দ অশ্রু

স্বপ্নের নায়ক

প্রেম পিয়াসী

 

 

তথ্যসূত্র: সর্ট বায়োগ্রাফি ডটকম, বিবিসি ডটকম এবং জকিগঞ্জ অনলাইন অবলম্বনে।

More news