ঢাকা ফিভার



সেই ১৯৬৬ সালে প্রথম আবির্ভাব ঢাকাতে। এখন শুধু ঢাকাতে না ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশব্যাপী। বাড়ছে রোগীর সংখ্যাওএই তো গত বছর আমাদের মাশরাফি, আমাদের গর্ব। ওকেও কাবু করেছিল। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ছেলে। সেও মারা গেল এই জ্বরে। আরও যে নাম না জানা কতজন আক্রান্ত হয়েছে। কেউ বা চলে গেছে না ফেরার দেশে।

এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ডেঙ্গু জ্বরের কথা বলছিএর প্রথম নামই ছিল ঢাকা ফিভার। প্রথম ঢাকাতে দেখা দেয়। ঐ সময় পরীক্ষা নিরীক্ষা ও গবেষণার তেমন সুযোগ ছিলনা প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি। তাই বিশেষজ্ঞরা নাম দেন ঢাকা ফিভার

BBC বাংলা ২০১৫ অক্টোবর মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে -বাংলাদেশে গত দশ বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রকপ বেশি দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছেবাড়তে বাধ্য। আমারা কি আমাদের ঘর, চারপাশ পরিষ্কার রাখি? ফুলের টবে, অব্যবহৃত পাত্রে, ডাবের খোসায়, পরিত্যক্ত টায়ারে, বাসার ছাদে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করিনা আর বাসার পাশে ড্রেন সে তো সদা প্রস্তুত এডিস মশার অভয়ারণ্য হতে।

এতো গেল শহরের কথাগ্রামেও কি আমরা এডিস মশাকে আমন্ত্রণ জানাই না? গাছের কোটর, বাঁশের গোড়ার কোটর, অপরিষ্কার ডোবার পানি পরিস্কার করি? করি না।
এডিস মশা ডেঙ্গু জ্বরের বাহক। এরা কিন্তু নিয়ম করে কামড়ায় সকাল-বিকাল কখনই রাতে না সূর্যোদয়ের আধঘণ্টা পরে ও সূর্যাস্তের আধঘণ্টা আগে। এ সময় কামড়াতে এরা ভীষণ ভালোবাসে! তাই এ সময়টা আমাদের সতর্ক থাকতে হবেসাধারণ মশা যদি কোন রোগীকে কামড়ায় তবে সেটিও ডেঙ্গু জ্বরের বাহক হয়ে যায়। তাই সব ধরনের মশা হতেই সাবধান!

তীব্র জ্বর-১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্তসারা শরীর জুড়ে লালচে দানাকিছু দিনের জন্য চলে গিয়ে পুনরায় দেখা দেয়াতীব্র মাথা ব্যথা, পিঠ ব্যথা অথবা দুটোই, চোখে ব্যথা, অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশীতে তীব্রব্যথাবমি বমি ভাব এবং বমিএইগুলো সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ।

ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরমারাত্মক! প্লেটলেট বা অনুচক্রিকার পরিমাণ কমে যায় সুস্থ দেহে অনুচক্রিকা ১০০ মিলিলিটারে থাকে দেড় থেকে প্রায় চার লাখ পর্যন্তকিন্তু এই জ্বর হলে তা নেমে যায় ২০ হাজার পর্যন্ত কখনওবা এর থেকেও কমফলে চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ হয় নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়এমনকি পায়ু পথদিয়েওরোগীকে তখন প্লাটিলেট দিতে হয় এই জ্বরে অনেক সময় মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

ডেঙ্গু শক সিনড্রোমএটি সবচেয়ে মারাত্মকতীব্রপেটে ব্যথা, ঘন ঘন বমি, জ্ঞান হারানো, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া লক্ষণ গুলো দেখা দিবে তে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

উপরোক্ত কোন একটা লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে নিজে নিজে কোন ব্যাথানাশক ওষুধ খাওয়া ঠিক হবে না। যেমন-ভল্টারিন অ্যাসপিরিন জাতীয় কোন এন্টিবায়োটিকও নাএতে হিতে বিপরীত হতে পারেতবে পথ্য গ্রহণ করতে হবে প্রচুরযেমন-ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, শরবত, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানিঅর্থাৎ বেশি বেশি তরল জাতীয় খাবার।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পেঁপে পাতা ডেঙ্গু জ্বরে কার্যকরী প্রতিষেধক। পেঁপে পাতার রসে প্লাটিলেট (অনুচক্রিকা) উৎপাদনে সাহায্যকারী উপাদান রয়েছে। প্রধান গবেষক AIMST ভার্সিটির প্রফেসর ডক্টর এস.কাঠিরেসান। ডক্টর এস. কাঠিরেসান এর মতে, ডেঙ্গুর ভাইরাস মূলত আমাদের রক্তের প্লেটলেট কমিয়ে দেয়।

অন্য আরেকটি গবেষণা হয়েছে ইউনিভার্সিটি অফফ্লোরিডা রিসার্চ সেন্টারেগবেষক ড্যাং দেখিয়েছেন পেঁপে পাতার রস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়যা দ্রুত ডেঙ্গু জ্বর সারিয়ে তুলতে সহায়ক। এমনকি পেঁপে পাতার রস ক্যান্সারেরও প্রতিষেধক।

শ্রীলঙ্কার ফিজিশিয়ান সানাথ হেট্রিগ শ্রীলংকান জার্নাল অফ ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানস এ এ বিষয়ক একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেনতিনিও বলেছেন কচি পেঁপে পাতার রস ডেঙ্গু জ্বরে খুবই উপকারী। হেট্টিগ এর মতে পেঁপে পাতায় কিমোপাপিন ও পাপেইন নামে দুটি এনজাইম থাকে এনজাইম গুলো প্লেটলেট উৎপাদন বাড়ায়রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় নাডেঙ্গুর কারণে লিভারের কোনো ক্ষতি হলে তাতেও প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে পেঁপে পেঁপে পাতায় আছে প্রচুর পরিমাণে কমপ্লেক্স ভিটামিনঅস্থি মজ্জায় প্লেটলেট উৎপাদন করতে সহায়তা করে।

রস করার জন্য কচি পাতা বেছে নিতে হবে এরপর এই পাতা খুব ভালো করে ধুয়ে ব্লেন্ডারে অথবা বেটে রস করতে হবেছেঁকে নিতে হবে। এর সঙ্গে কোনো চিনি কিংবা লবণ মিশানো যাবে নাপ্রাপ্ত বয়স্কদের দিনে দুবার৮ ঘন্টা বিরতি দিয়ে১০ মিলি লিটার পরিমাণ রস খেতে হবে থেকে ১২ বছর বয়সিদের ৫ মিলি লিটার৫ বছরের ছোটদের জন্য ২.মিলি লিটার।

ডেঙ্গু জ্বর! নির্দিষ্ট কোন টিকা নেই। কোন স্থায়ী প্রতিষেধকও নেই প্রাকৃতিক ভেষজ অথবা ডাক্তারের ওষুধ সবই প্রতিষেধকে সহায়কতাই আমাদের উচিত প্রতিরোধের প্রতি নজর দেয়াঘর, চারপাশ পরিষ্কার রাখা যাতে আমরা সুস্থ থাকতে পারিপরিবেশও সুন্দর রাখতে পারি।
তথ্যসূত্রঃ জাতীয় ই তথ্যকোষ, BBC বাংলা ও সাস্থ্যকথা অনলাইন ম্যাগাজিন

More news