কাব্যর স্কুল



১৪ বছর বয়সে বিয়ে আর ১৬ তেই বাচ্চা। তারপরও কি অদম্য উৎসাহ বৃষ্টির! সংসারের কাজ গুছিয়ে ঠিক ৩ টায় রবীন্দ্র সরোবরের বটগাছের নিচে তাকে দেখা যাবে খাতা হাতে, জোরে জোরে ইংরেজি অক্ষর পড়তে। শুধু বৃষ্টি না, ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী অনেক শিশুদেরকে বিকাল ৩টায়  দেখা যায় বটতলার এই ছোট্ট পাঠশালায়। সকালে ফুল ও হাওয়াই মিঠাই বেচে, বোতল টোকায়। এরপর দুপুরের খাওয়া শেষে পড়বে বলে গুটিগুটি পায়ে চলে আসে বটতলায়

একদল ইউনিভার্সিটির ছাত্র, যাদের অবসরে মুভি দেখার কথা, গেমস খেলার কথা! তারা বিসর্জন দেয় সেই ভালোলাগার বিষয়গুলোকে দূর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসে এই বাচ্চাগুলোর মুখে হাসি ফোটাবে বলেতাদের দু চোখে স্বপ্ন এঁকে দেবে বলে।

স্বপ্নের পেছনের গল্প

ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাগুলোর জীবনে আলো আনার এই স্বপ্ন দেখাটা কিন্তু একদিনের না। তার জন্য ফিরে যেতে হবে আরও ২০ বছর আগে। যখন এক ছোট্ট ছেলে দেখত, তার শিক্ষক বাবা উঠোনে বসে একদল ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছে, একটু একটু করে বদল আনছে তাদের জীবনে। সেই ছেলেটিই বড় হয়ে স্বপ্ন দেখে, যাদের আমরা দূর দূর ছাই ছাই করি, সেই পথশুশুদের জীবন বদলে দিবে সে। আর সেই বদলের পিছনে শিক্ষাই হবে একমাত্র চালিকাশক্তি।


মিঠুন দাস কাব্য। আর দশটা যুবকের মতই মুভি দেখে, আড্ডা দেয়, গান শুনে। ফিল্ম নিয়ে পড়াশুনা করলেও আজীবন ইচ্ছা স্রোতের বাইরে বাচ্চাদেরকে স্রোতে ফিরিয়ে আনা। তাই টুকটাক ফিল্ম বানানোর পাশাপাশি সমাজের এই খেটে খাওয়া ঝড়ে পড়া পথশিশুদেরকে শিক্ষিত করার ব্রতে নামেছোট্ট সেই ছেলে, যে একদিন বাবাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিল, সেই আজ অনুপ্রাণিত করে শত শত তরুণকে।

কাব্যর কথা

প্রজেক্টের নাম “আলোকিত শিশু”। উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন একটি মডেল তৈরি করা, যার মাধ্যমে “ঝড়ে পড়া শিশুদের স্কুলমুখী করা যায়” এই প্রজেক্টের ডিরেক্টর হচ্ছে মিঠুন দাস কাব্য।

এই প্রজেক্টের পেছনের গল্প জানতে হলে, জানতে হবে “গর্ব বাংলাদেশ” এর কথা, জানতে হবে নুহীন খান ভাইয়ের কথা, যিনি হচ্ছেন “গর্ব বাংলাদেশ” অর্গানাইজেশনের স্বপ্নদ্রষ্টা। এই অর্গানাইজেশনের  একটি প্রজেক্ট “প্রজেক্ট আলোকিত শিশু”। কীভাবে এই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত হলেন কাব্য সে বিষয়ে বিডিইয়ুথকে বলেছেন “ আমি গর্ব বাংলাদেশের একজন ভলান্টিয়ার ছিলাম, এখনও আছি। তখন উত্তরায় আমাদের অফিস ছিল। বসে বসে প্ল্যান করতাম কি করা যায় এই পথশিশুদের জন্য। দু মাস আমি বিভিন্ন জায়গায় গেলাম, বাচ্চাদের বোঝান চেষ্টা করলাম “পড়াশুনা করা কতটা জরুরী, পড়াশুনা করলে তুমি বড় হবে অনেক” এইসব। ধরে ধরে বাচ্চাদের বোঝাতাম। একটা সময় ওরা রাজি হল, বলল আমরা যদি রেগুলার হই, তারাও আসবে স্কুলে। প্রথম দিকে ৩ দিন যেতাম সপ্তাহে। ওরা তিনদিনে ঠিক স্কুলের ফিলটা পাচ্ছিল না , তাই প্রতিদিন যাওয়া শুরু করলাম। প্রথম ৮-১০ জন দিয়ে শুরু হয়েছিল, পরে ধীরে ধীরে বাচ্চা বাড়ল।

স্কুলের কথা

এখন মোট ৪৫ জন স্টুডেন্ট আছে এই স্কুলে। খাতায় নাম লেখা আছে ৪৫ জনের, তবে নিয়মিত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২০ জনের মত। স্টুডেন্ট বাড়ানোর জন্য কাব্য চিন্তা করছেন একবেলা যদি ভরপেট খাওয়ান হয়, তাহলে ৩০ জন নিয়মিত স্টুডেন্ট পাবেনই তারা।

কাব্য অনেকগুলো এলাকায় অনেকগুলো স্কুল চালনা করতে চান, তা না হলে সত্যিকার পরিবর্তনটা আসবে না। আজকে তিনমাস থাকবে, কালকে থাকবে না, এইভাবে ঠিক সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট আসে না। কাব্য সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে এক পরিবর্তন চায়। একটা মডেল দাড় করাতে চায়। যেই মডেলের অধিনে একজন বাচ্চাকে ছয় মাস থেকে এক বছরে “প্রজেক্ট আলোকিত শিশুর” স্কুলে দেখা হয়

যদি তার পারফরম্যান্স ভাল হয়, যথোপযুক্ত ব্যবহার শিখে নেয়  তখন তাকে একটি ভালমানের স্কুলে ভর্তি করা হয় । শুধু ভর্তি করেই ক্ষান্ত হন না তারা, ঐ স্কুলে বাচ্চাটির পড়াশুনার সমস্ত খরচ বহন করার জন্য এবং তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেক বাচ্চার জন্য  একজন করে ডোনার ঠিক করে দেওয়া হয়। এই ডোনার মূলত কাছের মানুষ এবং পরিচিতদের মধ্যেই ঠিক করে দেওয়া হয়, যারা বাচ্চার পড়ার খরচ চালাবে।

কাব্যর স্কুলের ভলান্টিয়াররা

দিন দিন বাড়ছে এই স্কুলের জন্য ভলান্টিয়ারদের সংখ্যাএখন সর্বমোট ২৫ জন ভলান্টিয়ার আছে। এদের কেউ পড়াশুনা করছে, কেউ জব হোল্ডার। সবাই নিজ উদ্যোগেই এইখানে স্বেচ্ছাসেবীর কাজ করছে। সবাই যে পড়াচ্ছে তা কিন্তু না! কেউ কারিকুলাম বানাচ্ছে. মেইনস্ট্রিম স্কুলে কি কি পড়ান হচ্ছে, সেগুলো যাচাই বাছাই করে, পথশিশুদের উপযোগী করে এই কারিকুলাম বানাচ্ছে তারা।

কেউবা এই পথশিশুদের মা বাবার সঙ্গে স্কুলের কানেকশন করিয়ে দেয়। এদের বাবা মা কোন বাড়িতে কাজ করে, কি কাজ করে এইসব ইনফরমেশন স্কুলকে দেওয়ার কাজ করে এই ভলান্টিয়াররা।

ভলান্টিয়ারদের কেঊ কেউ স্কুলের শিক্ষকদেরদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেযারা স্টুডেন্ট হিসেবে মনযোগী, মেইন্সট্রিম বাচ্চাদের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে, তাদের কে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ানোর জন্য লিংক তৈরি করেন ভলান্টিয়াররা। অনেক সময় স্কুলগুলোতে অনুরোধ করা হয় তাদের যেন বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

বাসায় বসেই অনেক ভলান্টিয়াররা  পথশিশুদের নিয়ে রিসার্চ করছে। কাব্যর স্বপ্ন পথশিশুদের নিয়ে একটি বিশাল প্লাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে দেশের সব পথশিশুদের গল্প থাকবে। জেলা পর্যায় থেকেও  অনেকে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।

বাচ্চারা কি শিখছে এই স্কুল থেকে? কতটা মানসম্মত এই স্কুলের শিক্ষা? স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে! এই প্রশ্নের উত্তরে কাব্য বলেন “আমরা যে কারিকুলাম  তৈরি করেছি তা মূলধারা স্কুলগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরও পাশাপাশি আমরা বাচ্চাদের অরিগ্যামি শেখাই বিভিন্ন রকমের। যেমন কাগজ দিয়ে নৌকা বানান বা প্লেন বানান ইত্যাদি”।

ফান্ডিং

এই স্কুলের জন্য কিন্তু কোন বিশেষভাবে ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা নেই। ফান্ডিং বলতে নিজেদের বন্ধুবান্ধব, ভলান্টিয়াররা মাসে ৫০০ টাকা করে দেয়। তাদের নিজ উদ্যোগেই বাচ্চাদের জন্য মেডিক্যাল ক্যাম্প করা , ওষুধ দেওয়া হয় এখানে। হয়ত কোন পরিচিত ডাক্তার বা কোন পরিচিত ফার্মেসি পথশিশুদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে বিনাপয়সায় ওষুধ ও সেবা দেয়স্কুল থেকেই নিজেদের ফান্ডের টাকার মাধ্যমে রোগজীবাণু থেকে রক্ষা করতে এবং পরিচ্ছন্ন জীবন বজায় রাখতে স্টুডেন্টদের প্রত্যেককে স্যান্ডেল দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালের বিজয় দিবসে তাদেরকে সাবান, টুথপেস্ট, শ্যাম্পু, নেইলকাটার, ভ্যাজলিন ও ব্রাশ সম্বিলিত একটি গিফট বক্স দেওয়া হয়েছে।

কাব্যর কয়েকজন ছাত্রঃ

কমলা জামা পড়ে দাঁড়িয়ে ছিল ১০ বছর বয়সী আইরিন। নিজেই কাছে গিয়ে একটা চকোলেট দিয়ে নাম জিজ্ঞেস করলাম। হাসিখুশি আইরিন চকোলেট খেতে খেতে  বলল, মা কাজ করে বাসা বাড়িতেসকাল থেকে বোতল টুকায় সে। তারপর স্কুলে আসে পড়তে। ইংরেজি পড়তে তার ভীষণ ভাল লাগে। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় সে, মানুষের সেবা করবে। ডাক্তার হবার দলে আছে সাদিয়া আর মীমও। ৮ বছর বয়সী সাদিয়ার বাবা নেই, নানী আর মাকে নিয়েই তার সংসার। হাওয়াই মিঠা বেচে সে মায়ের জন্য ভাত নিয়ে যায়। মীমের মা কি করে জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দেয় মাকে দেখেনি সে, মা থাকে ঐ ভাঙ্গা মসজিদে। মা কে খুঁজে পেতেই কি মীমের ডাক্তার হওয়া!

সুমাইয়ার স্বপ্ন পুলিশ হবে। পুলিশ হয়ে চোর ধরবে, মারবে। ১০ বছরের সুমাইয়াও হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করেখেতে ভালবাসে মুরগি। ছোট্ট আলেয়া খুঁজে পায় না কি খেতে সে ভালবাসে, কি হতে চায় সে জীবনেএই স্কুলে সে “আলিয়া ভাট” নামেই পরিচিত। আলিয়া ভাটের পুড়ি খেতে ভালো লাগে, লিখতে ভালো লাগে, পড়তে একদম না!

কাকলীর খাতা কাব্য আমাদের দেখিয়েছিলেন। ঝকঝকে লেখার অধিকারী কাকলী পাশের এক ছেলের সঙ্গে মারপিট করতে গিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বললই না। তবে মারপিট করলে কি হবে, অ্যানা আপু পড়া ধরলে সে ঝটপট বলে দেয় “H  for এইচ, ই, এন ...... hen মানে মুরগী”।

ছেলেদের মধ্যে বড় হচ্ছে হাসান ১১ বছর। পড়ার আগেই যত বাঁদরামি, স্কুল শুরু হলে সে শান্ত, পড়াশুনায় ভীষণ মনযোগী। হাওয়াই মিঠা বিক্রি করা হাসানের স্বপ্ন একদিন এতো বড় অফিসে জব করা। ওখানে গিয়ে শুনলাম ইমন কে নাকি আগের দিন বলা হয়েছে “আর দুষ্টুমি করলে স্কুলে রাখবে না তাকে”। কিন্তু ৮ বছরের ইমন, না মানে কারও বাঁধা। আবার দুষ্টুমি শুরু করল এসেই। রাজু আরেক ধাপ এগিয়ে। স্কুল থেকে জামাকাপড়, স্যান্ডেল দিলেও সে নোংরা হয়ে থাকতেই ভালবাসে। মা বাবা কেউ নেই রাজু আর ইমনের। অনেক ভেবেও ইমন খুঁজে পেল না কি হতে চায় সে। কিন্তু মুন্না ঠিক করে রেখেছে সে ইঞ্জিনিয়ার হবেই হবেই। ৮ বছরের রাতুলের স্বপ্ন হাওয়াই মিঠা বেচে, দোকান দিবে সে। বাজারের বড় দোকান!

বৃষ্টি সবচেয়ে বড় এই স্কুলের সবার চাইতে। বাচ্চা নিয়ে পড়তে আসে। যতক্ষণ পড়তে থাকে স্কুলে, নাদুস নুদুস বাবুটা ঘুরে বেড়াতে থাকে ভলান্টিয়ার আপুদের কোলে কোলে। জিজ্ঞেস করলাম এত কম ময়সে বিয়ে বাচ্চা, শরীরে সমস্যা হয় নি? “অনেক সমস্যা হইছে আপা, বাচ্চা হবার সময়ে, এখন ঠিক আছি, কিন্তু বাচ্চা দুর্বল”। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করি “স্বামী মারে?” ক্লান্ত দৃষ্টিতে মাথা নাড়ায়, বলে “ভালোবাসা আগে ছিল, এখন আর বাসে না”।

কি খেতে ভালবাস জিজ্ঞেস করলে অনেকেই অনেক কিছু বলেছে। মুরগী খেতে ভালবাসে সাদিয়া, সুমাইয়া। ডিম আর ডিমের কুসুম খেতে ভালবাসে রাজু, হাসান, মুন্না, ইমন। মীমের পছন্দ চকোলেট আর আইরিন ভালবাসে খেতে গরম গরম সমুচা! শুধু  রাতুলই  বলেছে অন্য কথা “বললেই কি আমাদের প্রিয় খাবার খাওয়াবেন”? আমি বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম রাতুলের দিকে, ঠিক কি বলা উচিত ছিল ভেবে পাই নি!

ফিরে আসছিলাম যখন, বিকালের রোদ নরম হয়ে আসছে। কাব্য জোরে জোরে নামতা পড়াচ্ছে  আট এক্কে আট, আট দুগুন ষোল”। চিৎকার দিয়ে পড়ছিল আলোকিত শিশুরা, যাদের হাতেই আছে আগামি দিনের মশালহয়ত আইরিন সত্যিই ডাক্তার হয়ে একদিন মানুষের জন্য কাজ করবে, সত্যিই হয়ত পুলিশ হয়ে সুমাইয়া একদিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলবে! হয়ত ইমন আলেয়াও খুঁজে পাবে তাদের স্বপ্নগুলো কোথাও না কোথাও!  

তাদের সেই স্বপ্নের সারথি হয়ে থাকবে বটতলার নিচে কাব্যের এই ছোট্ট স্কুল।

নিজস্ব প্রতিনিধি, বিডি ইয়ুথ

More news