সেই সুখন এই সুখন



মাথার উপরে খোলা আকাশ আর চারপাশে সব বহুতল ভবন। তিনজন মানুষ এই বিকেলের নরম রোদ গায়ে মেখে গল্পে মেতেছি। সোলায়মান সুখন গল্প বলে যাচ্ছেন আর আমরা শুনছি। ঠিক শুনছি না, কখনো হাসছি আবার কখনো চোখে জল মাখছি। সুখনের শৈশবের গল্প, লড়াইয়ের গল্প, জীবন থেকে জীবনের স্বাদ নেবার গল্প। যে গল্প মাঝেমাঝেই সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানিয়ে দেয়।

সুখন বলছেন, আমাদের সব ভাই-বোনদের ঈদের জন্য আলাদা আলাদা পাঞ্জাবি, পায়জামা ছিল না। কারো জন্য হয়ত পাঞ্জাবি থাকতো আর কারো জন্য পায়জামা। এক ভাই অন্য ভাইয়েরটা প্রায়ই ভুলে পরে ফেলতাম। আর তারপর শুরু হত এটা নিয়ে মান অভিমান। আজকাল মাঝেমাঝেই সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।

বর্তমানে আমরা আইটির বিজনেস প্রধান এই মানুষটা অকপটে বলে যাচ্ছিলেন নিজের গল্প। জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার গল্প। কখনোই খারাপ লাগেনি কাউকে এই গল্প শোনাতে। সুখন ভাবেন, তিনি নিম্ম মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছেন, তার বাবা আর্মির হাবিলদার ছিলেন, এটা বলে তিনি সহানুভূতি অর্জন করেন নাএটা তার জন্য গর্বের।

তার মতে, “এ গল্পটা জেনে হয়ত একজন বিশ্বাস করবে, আমরা নিজেরা চাইলেই আমাদের পরিবর্তন আনতে পারি। আমরা যেটাকে ভাগ্য বলে গালি দেই, অন্ধের মত বিশ্বাস করে বসে থাকি, আসলে এই ভাগ্য বলতে কিছু নেই। জন্ম যেখানেই হোক না কেন, যে পরিবার কিংবা পরিবেশে বেড়ে উঠি না কেন, নিজের একান্ত চেষ্টায় স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

আজকের সুখন হওয়ার গল্প বলে যান তিনি, “আমি পাঁচ বছর নেভির অফিসার পদের চাকুরী ছেড়ে যখন ঢাকায় আসি তখন জানতামই না আইবিএ কি! এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল সবকিছু। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি যখন একটা জাতীয় প্রতিযোগিতার মধ্যে দিয়ে নেভিতে সুযোগ পেয়েছিলাম, তখন আমাকে দিয়ে কিছু না কিছু একটা হবেই। কখনো হতাশ হইনি।

এক বন্ধুর পরামর্শে আইবিএর এমবিএতে পরীক্ষা দেই। ছয় মাস আতেলের মত জীবন যাপন করেছিলাইব্রেরীতে থেকেছি। ফলাফল আইবিএর এমবিএতে চান্স। আর এটাই আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আজকের সোলাইমান সুখন হবার পেছনে তাই এই পরীক্ষার প্রভাব অনেক বেশী।

আর এটা থেকে ভালভাবে শিখেছি সবার জীবনে সতের থেকে উনিশ বয়সটার প্রভাব অনেক বেশী। এই বয়সেই সবাই ক্যারিয়ারের একটা দিক খুঁজে নিতে চায়। কেউ হয়তো ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার। নেভিতে টিকে যাওয়াটাই আমার আত্মবিশ্বাস সবসময় বাড়িয়ে দিত।

মানুষটা তরুণদের শুধু মোটিভেশনাল স্পীচই  দেন না, নিজেকে আরও একটা পরিচয় দিয়ে থাকেন একজন স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হিসেবে। আর এটা আপনি প্রতি মুহূর্তেই একথা মনে করবেন যদি আপনি কিছু সময় কাটিয়ে থাকেন এই প্রাণবন্ত মানুষটার সাথে। কখনোই মনে হবে না ভদ্রলোক পঁয়ত্রিশ পা হয়েছেনসদা তরুণ এই মানুষটা কিভাবে এত দুঃখ পার করে এসে মানুষকে হাসিয়ে রাখে এটাও আপনাকে অবাক করবে।

এটা নিয়েও কথা বললেন সুখন, আমার কাছে মনে হয় জীবনটাকে আনন্দ নিয়ে উপভোগ করাই জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। মানুষ কি ভাবছে তার জন্য থেমে থাকা চলবে না আমি এখন যে সময়টা পার করে যাচ্ছি সে সময়টাই আমার জীবনের শেষ সময় হতে পারে

আমরা সবাই জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়ে দেই মানুষ কি ভাবছে এটা নিয়ে ভেবে পরে একটা সময় এসে আফসোস করতে হয় অনেকেই অন্যের পছন্দের অপছন্দের কথা ভেবে নিজের কাজ কোনদিন করে উঠতে পারে না

আমরা অনেকেই নিজের কর্ম ব্যস্ততায় ভুলে থাকি আমাদের পরিবার আর কাছের সব বন্ধুদের একটা সময় অনেক বেশী করে চাইলেও এদের আর কাছে পাওয়া যায় না আমি মনে করি সবারই উচিত নিজের পরিবার আর প্রিয়জনদের বেশী করে সময় দেওয়া

কর্পোরেটের নানান ব্যস্ততা, ভার্চুয়াল জগত, ব্লগিং, গেস্ট লেকচারার, স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান, এত পরিচয়ের পরেও তিনি একজন সফল বাবা, সফল স্বামী আর একজন ভালো বন্ধু এখনও সময় করে ছুটে যান পরিবার নিয়ে সিনেমা দেখতে, শপিং করতে আর বেড়াতে বন্ধুদের কাছে সেই পুরোনো সুখন আর ভক্তদের কাছে স্টান্ডআপ কমেডিয়ান কোথাও যেন ঘাটতি নেই

গল্পে গল্পে জানতে পারি সেদিনও এত ব্যস্ততার মাঝে কাটিয়েছিলেন কিছু সুবিধা বঞ্চিত বাচ্চাদের সাথে তাই আসতে ত্রিশ মিনিট দেরি তরুণদের নিয়ে কাজ করতে চান আরও অনেক বড় পরিসরে স্কুল কলেজের বইয়ের বাইরেও আরও একটা পৃথিবী থাকে, যেটা আমাদের তরুণদের এখনো অজানা তাদের এই গণ্ডির বাইরে এখনো দক্ষতা বৃদ্ধির কোন সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে না

সে ব্যাপারে সুখন বলেন, “আমার একটা আইডিয়া আছে, যেখানে আমাদের তরুণরা বিশ্ববাজারে নিজেদেরকে চেনাতে পারবে আর উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে পারবে নিজেদের একজন ওয়ার্ল্ড ক্লাস হিউম্যান বলে পরিচয় করাতে পারবে সেজন্য এখন থেকেই প্লান করছেন কি উপায়ে তরুণদের আরও উদ্বুদ্ধ করা যায় বানাতে চান আরও অনুপ্রেরণা দেয় এমন ভিডিও যার মাধ্যমে অগণিত তরুণদের মধ্য জায়গা করে নেওয়া সম্ভব হবে

চায়ের বিরতি শেষ করে ফিরছিলাম সোলায়মান সুখনের পছন্দের সিনেমা নিয়ে শুরুতেই বলছিলেন, গডফাদার সিনেমার কথা, যেখানে দিন শেষে ফ্যামিলি সবচেয়ে বড় হয় তারপর নিজের নেভি জীবনের সাথে সম্পর্কিত সিনেমা অ্যা ফিউ গুড ম্যান এরপরই  তালিকায় আছে পারসুইট অফ হ্যাপিনেস, সেভেন ম্যান আর্মি, ফরেস্ট গাম্প, কাস্ট অ্যাওয়ে এর মত জনপ্রিয় সব সিনেমা

সব সিনেমা থেকে সুখন অনুভব করেন, এক মিনিটের মধ্যে অতীত সময়টা ইতিহাস হয়ে যাবে।  বর্তমানটা কিছু মুহূর্তের মধ্যেই অতীত হয়ে যাবে, আর ভবিষ্যৎ তুমি প্রস্তুত হবার আগেই দৌড়াবে। তাই জীবনে এমনভাবে বাঁচতে শিখতে হবে যাতে করে প্রতিটা মুহূর্তই যেন আনন্দে কিংবা অপচয় না করে কাটানো যায়।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে, জীবনে এমন কিছু অর্জন করা উচিত যাতে মৃত্যুর আগের মুহূর্তে সেই মুহূর্তগুলো মনে করে হাসি দেওয়া যায়। এমন যাতে না হয় শেষ জীবনে বলার মত কোন অর্জনই না থাকে। তাহলে এর থেকে দুঃখজনক আর কিছুই থাকবে না।

ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। চারপাশের বহুতল ভবনগুলোয় আলো জ্বলতে শুরু করে দিয়েছে। সোলায়মান সুখন এখান থেকে যাবেন আরও একটা কর্পোরেট মিটিংয়েতারপর সেখান থেকে বাসায়। স্কুলের বন্ধুরা মিলে মাঝরাত পর্যন্ত গাইবেন স্কুল পালানোর গান। রাতের শেষে আবার আইটির বোর্ড মিটিং। শনি আর রবি দুই দিন মেয়ের জন্য বরাদ্দ। ফিরে আসতে আসতে আমাদের ফটোগ্রাফারের তোলা সুখনের ছবিগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম একটা মানুষ কিভাবে এতটা মন ভরে জীবনের স্বাদ নিচ্ছেন! তবে এতক্ষণ আড্ডার পর আর মোটেও অবাক লাগছে না।

নিজস্ব প্রতিনিধি

More news