আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির রোবট সম্রাট!!!



রোবট সম্রাট! নামটা শুনলে অনেকেই চমকে উঠবেনকিন্তু আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামটা শুনলে কেউ চমকে ওঠে না বরং নামটা শুনলে সবার বুক গর্বে ভরে ওঠে। ‘রোবট সম্রাট’ নামটা শুনলেই তাদের সবার চোখের সামনে মাথায় চুল কম, হাসি মাখা একটা মুখ ভেসে উঠে!!

ক্যাম্পাসে প্রায়ই ছেলেটিকে জটিল সব সার্কিট আর রোবটিক বডি নিয়ে ছুটতে দেখা যায়। পরিচিত কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “কিরে বন্ধু কই যাস, হাতে এটা আবার কি?” সম্রাট তখন মাথা চুলকে জিনিসটার বিশাল ইতিহাস বর্ণনা করে, যার অনেকটাই সেই বন্ধুর মাথার একহাত ওপর দিয়ে যায়। কিন্তু যখন দুইদিন পরেই সম্রাট তার বানানো রোবট নিয়ে প্রজেক্ট ফেস্টে অংশ নেয়, তখন সবাই মুগ্ধতা নিয়ে তার উদ্ভাবন দেখে তাকে বাহবা দেয়।


স্বপ্ন যাত্রার শুরু:

গাইবান্ধা জেলার পদুমশহর গ্রামে  জন্ম নেয়া মোঃ রওশন হাবীব সম্রাট ছোটবেলা থেকেই ইলেক্ট্রনিক জিনিসের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ অনুভব করত। তার সমবয়সী ছেলেরা যখন স্কুল পালিয়ে খেলার মাঠে ছুটে যেত তখন সম্রাট ভাবত, কিভাবে একটা লাল কিংবা সবুজ এলইডি লাইটকে জ্বালাবে? কিভাবে একটা ছোট মোটরে কাগজের পাখা লাগিয়ে তা ঘুরাবে? তার এই আগ্রহ একটু বড় হতেই পরিণত হল স্বপ্নে।

সম্রাটের স্বপ্ন ছিল সে অনেক বড় ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হবে। তার মামা সোহাগের কাছ থেকেই তার ইলেক্ট্রনিকসের হাতেখড়ি। সোহাগ মামার বানানো কলিংবেল, ছোট টুইন ওয়ান, বিভিন্ন সার্কিট ডিজাইন তাকে এই বিষয়ে আরো অনুপ্রাণিত করে। তখন থেকেই সে ইলেক্ট্রিক্যাল বিষয় নিয়ে পড়বে বলে মনস্থির করে।

স্বপ্ন যাত্রার পথে:

সম্রাটের বাবা মোঃ সাইদুর রহমান একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, আর মা মোসাঃ রওশন আরা একজন গৃহিণী। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সম্রাট। স্কুল ও কলেজ জীবন কেটেছে গাইবান্ধাতেই। পরে আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিষয়ে সুযোগ পেয়ে সে তার স্বপ্নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। সম্রাট সুযোগ খুঁজতে থাকে নিজেকে প্রমাণ করার।

এরই মধ্যে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় চল্লিশটির বেশি রোবট সে বানিয়ে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রজেক্ট ফেস্টগুলোতে তার বানানো রোবটগুলো অনেকের নজরে আসে। এর মধ্যে আছে “হিউম্যান রোবট”, যা অপারেটরের অনুকরণে হাতের নড়াচড়া ও কমান্ড ফলো করতে পারে ইনসেক্ট রোবট” যা দুর্গম পাহাড়ে কিংবা উঁচু নিচু পথে সাবলীল ভাবে চলতে পারে এই ধরনের রোবটগুলো খুব প্রশংসিত হয়। কিন্তু এখানেই সে থেমে থাকেনি।

সম্প্রতি সে ‘অটোমেটেড গার্মেন্টস এন্ড সিকিউরিটি সিস্টেম’ নামক প্রজেক্ট করে, যা তার এখনও পর্যন্ত সেরা প্রজেক্ট। সম্রাটের এই প্রজেক্টের বিশেষত্ব হল এই প্রজেক্টের মাধ্যমে খুব কম খরচে একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির সকল ধরনের ত্রুটি দূর করা সম্ভব। এই প্রজেক্টটিতে সে প্রায় ১০ রকমের ফিচার রেখেছে যা অনেকগুলো সেন্সর দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হবেএর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি হল,

১. অটোমেটিক গেটলক:

এর মাধ্যমে মেইন গেটের স্বয়ংক্রিয় মেশিনে গার্মেন্টস কর্মীরা তাদের কাছে থাকা আইডি কার্ড স্ক্যান করে ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে এবং অপরিচিত কেউ প্রবেশ করতে পারবেনা।

২. ফায়ার কন্ট্রোল:

মূলত গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তিনটি স্থানে আগুন লাগার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কেমিক্যাল রুম, ডিজেল রুম ও কিচেনতাই এই জায়গাগুলোতে স্মোক ডিটেক্টর, ফ্লেম ডিটেক্টর অথবা ইনটেনসিটি ডিটেক্টর, টেম্পারেচার ডিটেক্টর, মিথেন গ্যাস ডিটেক্টর, অটোমেটিক কার্বন ডাইঅক্সাইড স্প্রেয়ার এবং ওয়াটার স্প্রেয়ার সেন্সরগুলো একসাথে বসানো থাকবে এর ফলে যেভাবেই আগুন লাগুক না কেন তা সেন্সরগুলোতে ধরা পড়বে এবং পুরো ওয়ার্কশপের পাওয়ার সাপ্লাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

এর সাথে সাথেই ১২ ভোল্টের একটা ডিসি সাপ্লাই থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে, যা দিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ গুলো করা হবেএরপর একটি অ্যালার্ম বেজে উঠবে যা ১ কি.মি পর্যন্ত শোনা যাবে এবং দরজাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে। এতে কর্মীরা সুবিধামত বের হয়ে যেতে পারবে। এছাড়া আগুন লাগে এমন জায়গাগুলোকে আলাদা ভাবে স্থাপন  করা হবে যেন কর্মীরা নির্বিঘ্নে বের হতে পারে। সেই সাথে ভয়েজ কন্ট্রোলের মাধ্যমে মূল মেশিনগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ করা হবে

৩. বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন:

ফ্যাক্টরির বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সহজ উপায়ও এই প্রজেক্টের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

টিম ইনফিনিটির যাত্রা শুরু:

একটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে যাওয়ার পর সম্রাটের মাথায় প্রথম এই চিন্তাটি আসে সম্রাট লক্ষ্য করে অব্যবস্থাপনা আর অদক্ষতাই গার্মেন্টস কর্মীদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সম্রাটের খুব বেশি ধারণা ছিলনা। তাই সে তার ভার্সিটির শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করে। এদের মধ্যে হাসিব স্যার, নয়ন স্যার, তানিম স্যার তাকে বিভিন্ন ভাবে পরামর্শ এবং উৎসাহ দেনকিন্তু কাজটা একা করা সম্ভব ছিলনা মোটেই। এগিয়ে আসে তারই ক্লাসের ৩ জন বন্ধু।

গড়ে উঠে ‘টিম ইনফিনিটি’, যাদের স্বপ্ন অসীম। তবে স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালো অর্থ। পরীক্ষামূলকভাবে ইনফিনিটির সদস্যরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে তাদের স্বপ্নের পথে প্রথম পা রাখেপরে তাদের কাজের অগ্রগতি দেখে আহসানউল্লাহ-র ইলেক্ট্রিক্যাল বিভাগের প্রধান ডঃ আবু মোল্লা স্যার তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে রাজি হনমাত্র সাড়ে আট হাজার টাকা খরচ করে তারা বানিয়ে ফেলে তাদের স্বপ্নের প্রজেক্ট।

পুরস্কার প্রাপ্তি:

প্রথমে আহাসানুল্লাহ সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যার প্রতিযোগিতায় তারা প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এরপর ইসলামিক ইউনিভার্সিটি,  রুয়েট,কুয়েটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সম্রাট আর তার ‘টিম ইনফিনিটি’ তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করে। শুধু তাই নয়, এই প্রতিযোগিতাগুলোতে অংশ নিয়ে তারা সর্বমোট পঁচাশি হাজার টাকা, সার্টিফিকেট এবং স্বর্ণপদক পুরস্কার পায় যা তাদের জন্য এবং আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিরল সম্মান বয়ে এনেছে।

সম্রাটের আক্ষেপ:

সম্রাটের একটাই আক্ষেপ, তার ভার্সিটিতে কোন রোবোটিক্স ক্লাব নেই। সে চায় খুব শীঘ্রই বিভাগীয় প্রধানের কাছে সুপারিশ করে একটা রোবোটিক্স ক্লাব বানাবে। যেখানে সম্রাট এবং তার টিম ভার্সিটির জুনিয়র ভাই বোনদের হাতে কলমে রোবট বানানো শেখাবে যাতে করে তারাও আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হয়ে এরকম আরো অনেক সম্মান অর্জন করতে পারে

সম্রাটের পরামর্শ:

যারা রোবটিক্স শিখতে আগ্রহী তাদের জন্য সম্রাটের পরামর্শ হল, তারা যেন হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের প্রাথমিক বিষয়গুলো খুব ভালভাবে আয়ত্ত করে। তাছাড়া ইউটিউবে রোবটিক্স এর ওপর বিভিন্ন টিউটোরিয়াল দেখার পাশাপাশি ভার্সিটির সিনিয়রদের কাছ থেকেও তারা সাহায্য নিতে পারে। তবে সবচেয়ে ভাল হবে যদি তারা রোবোটিক্সের যন্ত্রপাতি কিনে হাতেকলমে তা নিয়ে গবেষণা করে।

কারণ সম্রাটের পছন্দের উক্তি হল, ভুল কর এবং ভুল নিজেই তোমাকে শিখিয়ে দিবে।”

সম্রাট এবং তার “টিম ইনফিনিটি” এখন স্বপ্ন দেখে বিদেশ জয় করার। তারা রোবটিক্স দিয়ে শুধু আহসানুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়কে নয়, পুরো বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চায়।

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


More news