চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহান: গলফ নিয়ে স্বপ্ন অপার



“আমি মইনুল হোসাইন সোহান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে দ্বিতীয়বর্ষে পড়াশুনা করছিআর পড়াশুনার পাশাপাশি পরিচয় আমি একজন গলফার।”

এভাবেই নিজের পরিচয় দিয়ে বিডি ইয়ুথের সাথে আড্ডায় বসলেন সোহান। গল্পে গল্পে বেরিয়ে এলো তার শৈশবের কথা, গলফার হয়ে উঠা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।

বিডি ইয়ুথ: আপনার বেড়ে ওঠা?

আমার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলায় মিরসরাই থানা, অনেকটা ফেনী ঘেষা জায়গা সেখানেই আমার শৈশব কেটেছে। আমাদের বাড়ির নাম মাদারবাড়ি আর গ্রামের নাম জমাদার গ্রাম

বিডি ইয়ুথ: গ্রামের শৈশব কেমন ছিল?

আমার শৈশব ছিল গ্রামের দুরন্ত শৈশব বলতে যা বোঝায় ঠিক তেমনই। আমাদের বাড়িটা ছিল অনেকটা উপকূলীয় এলাকায়, যেটাকে আমরা কোস্টাল বেল্ট বলিমাঝে মধ্যে শহরে আসা হত। কারণ আমার ভাইয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন।

আর শৈশবে আমি বেশিরভাগ সময় কাটাতাম খেলাধুলা করে, গাছে উঠে, পুকুরে মাছ ধরে, লাফালাফি করে। পড়ালেখার প্রতি খুব বেশি ঝোঁক ছিল না। আমি মাদ্রাসার ছাত্র ছিলাম। মাদ্রাসায় ছুটির পরে আমরা দল বেঁধে জাল নিয়ে চরে মাছ ধরতে যেতাম। চরে মাছ ধরার একটা জায়গা ছিল বড়খাল

ঐ খালে গা ভাসিয়ে আমরা মুহুরি নামের যে ফেনী নদীটা আছে সেখানে চলে যেতাম। ছোটবেলার স্মৃতি বলতে গেলে আসলে শেষ হবে নাখুবই ডানপিটে ছিলাম। এজন্য খুব শাস্তিও পেতাম মাদ্রাসায় যেতে ভালো লাগত নাএভাবেই কেটেছে আমার শৈশব।

বিডি ইয়ুথ: পড়াশুনার পাশাপাশি আর কিছু, যেটা মনে খুব টানত?

খেলাধুলা আমাকে সবসময়ই খুব টানত। আমার পরিবার খুবই স্পোর্টিং ফ্রেন্ডলি একটা পরিবার। কেউ প্রফেশনাল লেভেলে খেলেননি কিন্তু সবারই খেলার প্রতি একটা আলাদা আগ্রহ ছিলআমার আব্বু ফুটবল খেলতেন। আমার চাচাও খেলতেন ফুটবল। আমার বড় ভাইও খেলাধুলা খুব পছন্দ করতেন। আমার বাড়িতে প্রচুর খেলাধুলার চর্চা হত।

বিডি ইয়ুথ: গলফ খেলার শুরুর গল্পটা একটু শুনতে চাই।

শৈশবে আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো ক্রিকেট খেলাটা কিন্তু ক্লাস সেভেনে যখন উঠলাম, তখন আমরা দুষ্টামির ছলে হকি খেলতাম। হকিস্টিক গুলো বানাতাম গাছের ডাল দিয়ে। আর খেলতাম টেনিস বল দিয়ে।

একদিন শহরে বেড়াতে এলাম ভাইয়ার কাছে, সেসময় টিভিতে গলফ খেলাটা দেখলাম। গলফ খেলা বলতে যে একটা খেলা আছে ওটা তখন জানলাম কিন্তু খুব বোরিং মনে হয়েছিল প্রথম দেখাতে। কিভাবে যেন বলটা মেরে কোথায় ফেলে, কোনই ইয়ত্তা খুঁজে পেলাম না

একদিন হকি খেলে বাসায় ফিরছি সেসময় ভাইয়াকে বললাম, “দেখো ভাইয়া আমি গলফ খেলে দেখাই তোমাকে” এরপর বলটাকে মাঠে বসালাম আর সেই হকিস্টিক যেটা আদতে একটা গাছের ডাল, ওটা দিয়ে একটা শট মারলামমজার ব্যাপার হলো, বলটা খুব সুন্দর করে ফ্লাই করল এবং পুকুরের একপাড় থেকে আরেক পাড় চলে গেল ব্যাপারটা অনেক বেশি মজার ছিল

এই ঘটনার পর ভাইয়া বলল “চল, আমরা গলফ খেলি!! আমি ভাইয়া আর আমার ২ জন কাজিন মিলে শুরু করলাম গলফ খেলা। জায়গাটা হচ্ছে আমাদের বাড়ির সামনেই। সেখানে একটা হোল করা হল। আমি ছিলাম সবার ছোট আর মোট খেলোয়ার ছিলাম ৪ জন। প্রথম খেলায় ভাইয়া চ্যাম্পিয়ান আর আমি রানার আপ। এরপর আমরা প্রায় টুর্নামেন্ট করে খেলতাম আর সাথে সাথে বাড়িতেও বিষয়টার প্রচার হয়ে গেল সেই সাথে খেলোয়ার বাড়তে থাকল

গলফ খুবই এক্সপেন্সিভ একটা খেলা তাই আমরা সেই গাছের ডালের বানানো হকিস্টিক গুলো দিয়েই খেলে গেলাম অনেকদিন। এখান থেকেই আসলে আমার স্বপ্ন দেখা শুরু।

বিডি ইয়ুথ: গলফকে প্রফেশন হিসেবে দেখেন কি?

হ্যাঁ, অবশ্যই দেখি তবে এটা প্রথম দিকের ভাবনা ছিল নাপ্রথম প্রথম ভাবতাম ক্রিকেটার কিংবা ফুটবলার হব। কিন্তু পরবর্তিতে এই গলফের প্রতি ভালোবাসাটা অনেক গভীর হয়ে যায়। আর এর মাঝেও অনেক চড়াই উতরাই ছিলপরিবার থেকে বলা হয় ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভাবতে তবু আমি খুব কৃতজ্ঞ যে, আমার পরিবার আমার স্বপ্নকে বুঝেছে। আমাকে সাপোর্ট করেছে ও এখনও করছে

বিডি ইয়ুথ: অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে এমন কোন ঘটনা কিংবা মানুষের গল্প যদি থাকে...

আমার পরিবারের মধ্যে বলতে গেলে, আমার চাচু এবং বড় ভাইয়ের কথা বলতে হয়। গলফার হান্নান যিনি আমাকে সর্বপ্রথম স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যে, গলফকে অবশ্যই পেশা হিসেবে নেয়া যায় আমাকে ভালো খেলার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিলেন আমার প্রথম খেলা দেখেইএছাড়া উনি ছিলেন আমার সর্ব প্রথম গলফ কোচতিনি পাশে ছিলেন বলেই আমার এতদূর এগিয়ে আসা।

এছাড়া গলফার সিদ্দিকুর রহমান স্যার-এর অনুপ্রেরণাও পেয়েছি যখন ২০১১ সালে প্রথম ঢাকায় গেলাম। উনি আমাকে রেফার করেন বাবুর আহমেদের কাছে যার কাছে আমি পরবর্তিতে গলফ ট্রেনিং নেইতিনিও খুব সাপোর্ট করেছেন।  


বিডি ইয়ুথ: এর মাঝে কি কোন ধরনের বাধার সম্মুখিন হয়েছেন? থেকে থাকলে কিভাবে তা ফেইস করলেন?

বাধা ছিল, অবশ্যই ছিলপ্রথমত গলফ খুব একটা প্রচলিত খেলা নাতাই খেলা প্র্যাকটিসের জায়গা সম্পর্কে ধারণা ছিল নাস্পোর্টস কিটস এর দাম খুব বেশি। সর্বপ্রথম যখন গলফ ক্লাবের ব্যাপারে জানতে পারি তখন এটা জানতাম না যে, সেই ক্লাবে প্রবেশ এবং খেলার অধিকার সংরক্ষিত শুধু মাত্র বিত্তবান কিংবা ক্লাবের অফিসারদের জন্য।

যেদিন ক্লাবে গিয়ে হাজির হলাম সেদিন আমার সাথে ছিল আমার চাচুআমরা ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করলে আমাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরে খোঁজ নিয়ে মেম্বারশিপ আর তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণটা শুনলামএটার পরিমাণ ছিল ৪ লাখ টাকা!! যেটা আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য একটা বড় বাধা ছিল নিঃসন্দেহে।

টাকার পরিমাণটা শুনে আমার চোখে সত্যি পানি চলে এসেছিল। ভাবলাম, হয়ত গাছের ডাল দিয়ে খেলতে খেলতে খুব বড় স্বপ্ন দেখে ফেলেছি। তবু আমার পরিবার সবসময় আমার পাশে ছিল। তাই হাল ছাড়িনি কখনোই।

এর অনেক দিন পর যখন সব বাধা পেরিয়ে আমি খেলতে লাগলাম, তখন হঠাৎ শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম। টানা সাড়ে ছয় মাস মাদ্রাসায় যেতে পারিনি, এতটাই অসুস্থ ছিলাম। কিন্তু তার পরেও কখনও একটা দিন এমন যায়নি যেদিন আমি গলফ নিয়ে ভাবিনি কিংবা একটাবারও গলফ স্টিকটা ছুঁয়ে দেখিনি!!

বিডি ইয়ুথ: আপনি এখন কোন পর্যায়ে খেলছেন? আর এর পাশাপাশি আমরা আপনার অর্জনের গল্পগুলো শুনবো...।

আমি এখন অ্যামেচার লেভেলে খেলছি। এরপরের লেভেল হচ্ছে প্রফেশনাল। প্রথম থেকেই আমার ফর্ম ভালো ছিল। সবসময়ই ভালো খেলার ও পারফর্মেন্স ধরে রাখার চেষ্টা করছিআমি রিসেন্টলি দুইটি জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্ট খেলেছি দুটোতেই চ্যাম্পিয়ান ছিলাম। অতিশীঘ্রই একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের টুর্নামেন্টে খেলবো।

বিডি ইয়ুথ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

অবশ্যই একজন ভালো গলফার হওয়া। তবে বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ জাতীয় গলফ দলে খেলা নিয়েই ভাবছি আর যদি আল্টিমেট গোল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তাহলে বলব “ইউ এস পিজিএ”তে খেলা। যেটা যেকোন গলফারের সর্বশেষ ও সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য!!

বিডি ইয়ুথ: বিশেষ কিছু কি আছে যা আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান

গলফ খেলাই আসলে আমার প্রথম ভালবাসা। এর থেকে প্যাশনেট আর কিছু হতে পারে না গলফের প্রতি আমার ভালোবাসা এমনই যে আমি মনে করি, সোহানকে ছাড়া গলফ ভাবা যায় কিন্তু গলফ ছাড়া সোহানকে ভাবা যায় না!!

আর সব শেষে বিডি ইয়ুথকে অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ।

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


More news