শুভ জন্মদিন, আজম খান!



“সে রাতে টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি কি একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে। আর সেখান থেকে ভেসে আসছে সুরঃ ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’বুঝলাম আজম খান গাইছে৷ আজম খানের সুন্দর গানের গলা৷ আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা৷” জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে এভাবেই আজম খানের কথা বর্ণনা করেছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রুমি!

আজম খান! একসময় যার আবক্ষ ছবি দেয়ালে দেয়ালে আঁকা থাকত। একসময় যার গানকে ঘিরে তরুণরা স্বপ্ন দেখত দিনবদলের!


আজ ২৮শে ফেব্রুয়ারি। আজ থেকে ৬৬ বছর আগে আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন পপসম্রাট আজম খান। ১৯৬৮ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন তিনি। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী’র সদস্য ছিলেন। তিনি আর ফকীর আলমগীর মিলে গণসংগীত প্রচার করেন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে।

সেই সময়ের কথা মনে করে ফকীর আলমগীর বলেন, “আজম খানের মধ্যে একটা স্বাধীনচেতা, দ্রোহী মন ছিল৷ সেই চেতনা থেকেই তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন”মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি হাতে অস্ত্র তুলে নেন। বাবার উৎসাহে যোগদান করেন মুক্তিযুদ্ধে। ঢাকায় একাধিক গেরিলা অভিযানে অংশ নেন তিনি। ঢাকার এক অভিযানেই প্রচণ্ড আঘাত পান বাম কানে। সারাজীবন সেই আঘাত বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি।


মুক্তিযুদ্ধের পর পড়াশুনা আর বেশি আগাননি। গানের মানুষ, গানের মধ্যেই ডুবে যান। পপ ঘরানার গান পরিচিত করে তোলেন দেশে। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের গানে যে নতুন জোয়ার আসে তা মূলত আজম খানের হাত ধরেই। সঙ্গে ছিলেন ফেরদৌস ওয়াহিদ, ফিরোজ সাঁই, পিলু মমতাজ এবং ফকীর আলমগীর। তারাই প্রথম ওপেন এয়ার কনসার্ট করেন বাংলাদেশে। তবে আজম খান নিখাদ পপ গানের সাধনাই করে যান আজীবন। তাই তখন থেকেই তাকে “পপসম্রাট” কিংবা “পপগুরু” বলে ডাকা হত।

নিজের ব্যান্ড দল “উচ্চারণ” সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে প্রথম অনুষ্ঠান করল ‘উচ্চারণ’। গীটারে ছিলেন নিলু এবং মনসুর, ড্রামে ছিলেন সাদেক আর ভোকালে ছিলেন আজম খান। দুটি গান রেকর্ড করা হল। ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গানদুটি দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা এনে দিল ‘উচ্চারণ’  ব্যান্ডকে।

এরপর ১৯৭৪-৭৫ সালে বিটিভিতে প্রচারিত হওয়া তার “রেললাইনের ঐ বস্তিতে” গানটি গেয়ে হইচই ফেলে দেয় আমজনতার মাঝে। এই গানই তাঁকে জীবন কিংবদন্তী করে তুলে। এর কিছু  সময় পরে বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন এসিড-রক ঘরানার গান “জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে”তিনি দাবি করেন এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক।

বিশ্বের বহুদেশে পারফর্ম করেছেন আজম খান১৭টি হিট গানের অ্যালবাম বেরিয়েছে। মিলিয়ন মিলিয়ন অ্যালবামের কপি বিক্রি হত তার। কিন্তু কপিরাইটের কারচুপির কারণে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না।  


২০১০ সালে মুখ গহ্বরের ক্যান্সার ধরা পড়ে তার। দু দফায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলেও অবস্থার উন্নতি ঘটে নিএক বছর দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে ৬১ বছর বয়সে ২০১১ সালের ৫ই জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন আমাদের পপসম্রাট।

আজম খানের “হারিয়ে গেছে খুঁজে পাবে না” গানের মত তিনিও না খুঁজে পাওয়ার দেশে হারিয়ে গেলেন। বন্ধু এবং সহশিল্পী ফকীর আলমগীর তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে বলেন “তাঁর মৃত্যু আমাদের জাতীয় জীবনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি”।

একসময় দেশের কনসার্ট  মানেই ছিল আজম খানের “ওরে সালেকা ওরে মালেকা”, “বাংলাদেশ হায় বাংলাদেশ” কিংবা “আলালের ঘরে দুলাল” গানগুলো। তাঁর মৃত্যুর পর অনেকেই সেই পুরানো আমেজ ফিরিয়ে আনার জন্য গানগুলো কভার করেন বিভিন্ন কনসার্টে। কিন্তু তাঁর গায়কী, গানের সঙ্গে শরীরের মুভমেন্ট কেউ করতে পারে নি, পারবেও না। এই জায়গায় পপসম্রাট আজম খান অনন্য। তাঁর পরে আর কেউ এখনো ‘আমজনতার গায়ক’ হয়ে উঠতে পারেননি।    

তথ্যসুত্রঃ ডিডব্লিউ ডটকম এবং উইকিপিডিয়া অবলম্বনে



More news