IUBAT-র লড়াকু অ্যাথলেট অনিতা বৃষ্টি



২০১৩ সালের কথা। ছিপছিপে গড়নের একটি মেয়ে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাইকের দিকে, কখন তার নাম ডাকা হবে!

মেয়েটি বাংলাদেশ গেমসএর একজন সাধারণ প্রতিযোগী। নাম ডাকা মাত্র উঠে যাবে আনইভেন-বার’স(Uneven bars) এর উপর। একের পর এক নাম মাইকে ঘোষণা হচ্ছে,  প্রতিযোগীরা দৌড়ে চলে যাচ্ছে ইভেন্টে যোগ দিতে। কিন্তু মেয়েটির নাম আর ঘোষণা হয় না। এক একটি মুহূর্তকে তার কয়েক ঘণ্টা বলে মনে হচ্ছে। অসহ্য লাগছে চারপাশের সব কিছুই।

আর লাগাটাই তো স্বাভাবিক, এই মুহূর্তে তার জ্বর ১০৩!! শুধু জ্বরই নয়, এর সাথে আবার যোগ দিয়েছে ভয়ংকর রকমের মাথাব্যথা। এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুক্ষণ পরেই শেষ হয়ে যাবে সারাজীবনের সাধনা। একে তো শরীর দুর্বল আর তার উপর বেড়েই চলেছে জ্বর। একবার ভাবল এক ছুটে বেরিয়ে যাবে হল থেকে। আবার কি সাত পাঁচ ভেবে আটকে রাখলো নিজেকে।

আর এর পরপরই মাইকে ঘোষণা হল মেয়েটির নাম, অনিতা আক্তার বৃষ্টি.....। চোখ বন্ধ করে মেয়েটি দৌড়ে গেল আনইভেন-বার’স এর দিকে। মেয়েটি আর কিচ্ছু মনে করতে পারে না।  এরপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে গেল। ফলাফল প্রকাশের পর বিচারকমণ্ডলী যখন মেডেল পড়িয়ে দিচ্ছিলেন বিজয়ীদের, তখন মেয়েটিকে দেখা গেল স্টেজের উপরে রাখা একটি উঁচু বেদীর উপর। সেই বেদীতে সাদা রঙে খুব সুন্দর করে লেখা ছিল প্রথম স্থান। বাংলাদেশ আনসারের হয়ে জিতে গেল গোল্ড মেডেল।  মেয়েটির চোখে তখন আনন্দের অশ্রু!!


এতক্ষণ পাঠক যা পড়লেন, এটি নিছক গল্প কিংবা সিনেমা থেকে কেটে নেয়া অংশ নয়। পুরো ঘটনাই একটি সত্য ঘটনা। আর এই ঘটনার নায়িকা  হলেন অনিতা আক্তার বৃষ্টি  সবার কাছে আনিতা নামেই বেশ পরিচিত। তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলোজির শিক্ষার্থী। চতুর্থ বর্ষে অর্থনীতি নিয়ে পড়ছেন। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে তার পরিচয় একজন অ্যাথলেট হিসেবে।

২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ গেমসে তিনি বাংলাদেশ আনসারেরহয়ে অংশগ্রহণ করেন। শরীরের এতো খারাপ অবস্থা থাকা সত্ত্বেও তার ঝুলিতে জমা পড়ে ২টি সোনা, ১টি রূপা ও ১টি ব্রোঞ্জ মেডেল। এছাড়াও তিনি জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে সর্বমোট ১৯টি পদক অর্জন করেছেন। মেয়েদের জন্য নির্ধারিত চারটি ইভেন্ট, যথা: আনইভেন-বারস, ব্যালেন্সবীম, ফ্লোর এক্সারসাইজ এবং ভল্টিং টেবিল। এই চারটি ইভেন্টেই অনিতা সমানভাবে পারদর্শী। তবে তার পছন্দের ইভেন্ট হল আনইভেন-বারস এবং ব্যালেন্সবীম।

জীবনের লক্ষ্য খুঁজে পেতে তাকে করতে হয়েছে অবর্ণনীয় কষ্ট। পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠ খড়, করতে হয়েছে সংগ্রাম। তার জীবনধারা অন্য আট দশটা সাধারণ মানুষদের থেকে আলাদা। অনিতা বড় হয়েছেন একটি শিশু কেন্দ্রে। শিশু কেন্দ্রটির নাম ‘ফ্যামিলি ফর চিলড্রেন(FFC)’। প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে অনাথ শিশুদের নিয়ে।


অনিতার শৈশব কেটেছে এই অনাথ কেন্দ্রে। শিশুকেন্দ্র দ্বারা পরিচালিত একটি স্কুলে তার হাতেখড়ি। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় তাকে নিয়ে শিক্ষকদের খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। পড়ালেখার পাশাপাশি তার খেলাধুলোয় ছিল ব্যাপক আগ্রহ। তখন থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একসময় তিনি দেশ সেরা অ্যাথলেট হবেন’। আর এই ব্যাপারটা ধরতে পারেন অনিতার শিক্ষক অজিত কুমার দাস। তিনিই ছোট্ট অনিতাকে বলেন বিকেএসপিতে ভর্তি হবার কথা। কিন্তু যেখানে খাবার জুটছে অনুগ্রহের পাত্রে, সেখানে স্বপ্নের মূল্য কতটুকু??

ঠিক এই দুঃসময়েই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন কেন্দ্রের পরিচালক ‘শিখা বিশ্বাস’। আর তার কারণেই অনিতা ২০০২ সালে বিকেএসপিতে ৪র্থ শ্রেণীতে ভর্তির সুযোগ পান। তিনি ২০০৯ সালে এসএসসি এবং ২০১১ সালে এইচএসসি পাশ করেন। আর এর পুরো সময়টা জুড়েই বিকেএসপিতে চালিয়ে গেছেন কঠোর প্রশিক্ষণ।

আনিতার অবসর সময় কাটে গান শুনে আর বই পড়ে। একজন অ্যাথলেট, এই পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি একজন গায়িকাও বটে। আরও একটা পরিচয় আছে, যা না বললে অন্যায় হয়ে যাবে। সেটা হলো, তিনি একজন ভালো ড্যান্সার। সেই ছোটবেলা থেকেই ছোট বড় নানারকমের অনুষ্ঠানে, স্টেজে পারফর্ম করেছেন গান ও নাচের।


ভার্সিটিতে যোগ দেয়ার পর থেকে এমন কোন অনুষ্ঠান নেই যেখানে অনিতা মর্ডান ড্যান্স করেননি। তবে পড়াশোনা আর প্রশিক্ষণের মাঝে যতটুকু সময় পান তার পুরোটাই কাজে লাগান শিশু কেন্দ্রের অন্যান্য শিশুদের জন্যে।

জীবনের প্রথম জয় কোনটি?

এমন প্রশ্নের উত্তরে শুরুতেই তিনি লম্বা একটি হাসি উপহার দিলেন। সেটা ২০০৩ সালের কথা। তখন তিনি সর্বপ্রথম জাতীয় পর্যায়ে জিমন্যাসটিকসে অংশ নেন। সেখানে তিনি অর্জন করেন প্রথমস্থান। সেটিই ছিল তার জীবনের প্রথম সাফল্য। আর এই ঘটনা যে তার মনোবলকে আরও বাড়িয়ে দেয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অ্যাথলেটিকস নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে জানালেন.....

তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলতে চান। জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসতে চান অলিম্পিক থেকে। লড়তে চান দেশ বিদেশের সব নামি দামী অ্যাথলেটদের সাথে। পড়ালেখাতেও তার সমান আগ্রহ। তিনি চান উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে, আর এই জন্যেই পড়ছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

ভার্সিটিটিতে জুনিয়র থেকে শুরু করে সিনিয়র পর্যন্ত সবাই চেনেন অনিতাকে। এ ব্যাপারে তার অনুভূতি কেমন, জানতে চাইলাম আনিতার কাছে। আবারো তার সেই ভুবন ভোলানো হাসি!! তার ভাষায়


“সত্যি বলতে কি, এই অনুভূতি বলে প্রকাশ করার মতো নয়। অনেক অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, বেড়েছে যোগাযোগ। ক্যাম্পাসের সিনিয়র থেকে জুনিয়ররা সবাই আমাকে চেনে। শিক্ষক ও ফ্যাকাল্টি যারা আছেন তারা সবাই আমাকে স্নেহ করেন। যেখানেই যাই না কেন, হোক সেটা ক্লাস রুম লাইব্রেরী কিংবা চায়ের টেবিল আমার আলোচনার বিষয় কিন্তু ‘জিমন্যাসটিকস’। আমার খুব ভালো লাগে এই বিষয়টাকে।”

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

More news