ড্যাফোডিলের জুবায়ের ‘সৌহার্দ্য’ নিয়ে সুবিধা বঞ্চিতদের দ্বারে



“ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করতে চাইতাম, বিশেষ করে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য বেশি খারাপ লাগতো ভাবতাম এই শিশুরা যদি পর্যাপ্ত শিক্ষা ও মৌলিক অধিকার পেতো, তবে সমাজে তারাও প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো।”

“সেই তাড়না থেকেই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পর ক্লাসের বন্ধুদের নিয়ে ২০১৫ সালের ১৭ই জুন ‘সৌহার্দ্য’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করি। সাধারণ কিছু শিক্ষার্থী যারা এখনো নিজেরাই আত্মনির্ভরশীল হওয়ার স্বপ্ন দেখে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এমন কিছু নবীন শিক্ষার্থীর হাত দিয়েই গড়ে তুলি “সৌহার্দ্য” নামের এই সংগঠনটি যা অলাভজনক সামাজিক সংগঠন হিসেবে মানুষের সেবায় কাজ করে যাচ্ছে। আসলে ‘সৌহার্দ্য’ গঠন করার মূল উদ্দেশ্যই ছিলো শিক্ষা, সুবিধা বঞ্চিত শিশু এবং অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করা


বলছিলেন ‘সৌহার্দের’ প্রতিষ্ঠাতা এ এম জুবায়ের। ‘সৌহার্দ্য’ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে এক নিঃশ্বাসেই তিনি বলে দিলেন এসব। পড়ছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক পর্যায়ের তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করলেন এবার। বিডি ইয়ুথ আজ তার মুখ থেকেই শুনবে সৌহার্দ্য পরিবারের গল্প।

বিডি ইয়ুথ: শুরুর গল্পটা কেমন ছিল? আর কেনই বা সামাজিক কাজের প্রতি আগ্রহ?

আসলে ছোটবেলা থেকেই আমার এমন কাজের প্রতি আগ্রহ। যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম তখন ছিলাম গ্রামেআর সেই সময় থেকেই আমার গ্রামের মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য চিন্তা করতাম। তাদের শিক্ষা, নিরাপদ পানি আর স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছা করতো। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাবে তখন আর করা হয়ে উঠেনি।

যখন ক্লাস এইটে উঠি তখন আমার পরিবারের সবাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে চলে আসেসেখানে আমি একটা সংগঠন “ভাষা ও সাহিত্য অনুশীলন কেন্দ্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়া”-র সাথে যুক্ত ছিলাম। আসলে এটা ছিল একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে এখানে আমরা অনেক সময় বৃক্ষরোপণ, রক্তদান কর্মসূচি, অসহায় দরিদ্র মানুষদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, দরিদ্রদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন সামাজিক কাজগুলোর সাথে জড়িত ছিলাম। আর মূলত, এখান থেকেই আমার সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন সামাজিক কাজগুলোর প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়।


যার চূড়ান্ত ফলাফল হলো আজকের এই সৌহার্দ্য”। মাত্র সাতজন সদস্য নিয়ে শুরু করা ‘সৌহার্দ্য’ আজ ৪০ জন সদস্যের একটি পরিবার। এই সংগঠনের সকল কার্যক্রম সদস্যদের চাঁদা দিয়েই পরিচালনা করা হয়।

বিডি ইয়ুথ: সামাজিক কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছে? কোন মজার ঘটনা?

সামাজিক কর্মকাণ্ড করতে গেলে বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন ছোটখাট ইভেন্টগুলো আমাদের সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ থেকেই করা হয়। কিন্তু বড় ইভেন্টগুলোতে আমরা আমাদের পরিচিত আত্মীয় স্বজন এবং বন্ধুদের থেকে অর্থ সহায়তা নিয়ে থাকি। এই কাজে অনেক মানুষ আমাদের সাহায্য করেছে, আবার অনেকে হতাশও করেছে। প্রশংসা বা নিন্দার এসব কথা না ভেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি আমাদের মূল লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য।

পঞ্চগড়ে কম্বল বিতরণের সুবাদে স্থানীয় লোকজন আমাদের কোথাও দেখলেই যথেষ্ট সমাদর করতো। একবার এক রিক্সাচালক আমাদের সকল সদস্যকে মিষ্টি আর চা খাওয়ালেন। আরেকবার এক লোক আমাদের দেখে ভাবলেন, আমরা যেহেতু এত অল্প বয়সেই ৩০০ কম্বল বিতরণ করার ক্ষমতা রাখি সেহেতু আমরা সেখানকার জমি-জিরাত বিলি বণ্টন করার ক্ষমতাও রাখি!!!

তিনি আমাদের বললেন, এই যে এত ভূমিহীন লোক আছে তাদের মধ্যে খাস জমিগুলো ভাগ করে দিচ্ছ না কেন? তবে কম্বল বিতরণের পর সেখানকার মানুষদের মুখে যে হাসি দেখতে পেয়েছি তা আমার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডগুলোর জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বিডি ইয়ুথঃ সৌহার্দ্য পরিবারের লাস্ট অ্যাকটিভিটিস কি ছিলো?

সর্বশেষ আমরা পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার কালিয়াগঞ্জ গ্রামে কাজ করেছি। এখানে আমরা ছিটমহল থেকে সদ্য বাংলাদেশের জাতীয়তা প্রাপ্ত ৩০০ দরিদ্র শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করি


যার অর্থ সংগ্রহ করা হয় ফেসবুক ইভেন্টের মাধ্যমে এবং প্রত্যেক সদস্যদের কাছ থেকে। আর এই দুটো মাধ্যম থেকেই আমরা মোটামুটি একটা ভালো অঙ্কের অর্থ সহায়তা পাই। সংগ্রহ করা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫ হাজার টাকার মত এই টাকা দিয়ে ৩০০ কম্বল কিনে ১৪ সদস্যের সৌহার্দ্যের একটি টিম চলে যাই পঞ্চগড়। যা দিয়ে আমাদের ইভেন্ট ভালভাবেই সম্পন্ন হয়।

এছাড়াও আমরা গত ৫ জুলাই ধানমন্ডি লেকে ৫০ জন পথশিশুকে ইফতার করাই, যেটা ছিল আমাদের প্রথম উদ্যোগ। তারপর ২৯ অক্টোবর সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের স্কুল ‘লাল সবুজ স্কুল’ এর ৩৫ জন শিক্ষার্থীকে পোশাক প্রদান করি।

বিডি ইয়ুথঃ সংগঠনটি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।

আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হল সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা। এজন্য আমাদের লক্ষ্য একটি স্কুল স্থাপন করা, যেখানে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ পাবে সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা। যদিও এটার জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি মাত্র।

এছাড়া আমাদের লক্ষ্য দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদেরকে বৃত্তি প্রদান করা, পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, বৃক্ষ রোপন করা, রক্তদান কর্মসূচি, দরিদ্রদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি। আর এরই অংশ হিসেবে আমারা ২১শে ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ের দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করি


এতো গেলো জুবায়েরের কাজ ও তার সৌহার্দ্য পরিবারের গল্পএবার তার সম্পর্কে কিছু জেনে নেয়া যাক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছেলে জুবায়েরএস.এস.সি করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে এবং এইচ এস সি করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে ২০১৩ সালে। তার পছন্দ  হুমায়ুন আহমেদ, সমরেশ মজুমদার, শরৎচন্দ্রের উপন্যাস এবং সায়েন্স ফিকশনের বই ভালো লাগে সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকতে, ঘুরে বেড়াতে, বই পড়তে ও ক্রিকেট খেলতে


যেহেতু কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ছেন তাই এই সেক্টরে তো অবশ্যই, সাথে সাথে একজন সামাজিক উন্নয়ন কর্মী হিসেবে কাজ করার প্রবল ইচ্ছাভবিষ্যৎ ভাবনা আর পছন্দের ব্যাপারগুলো এভাবেই অকপটে বলে ফেললেন জুবায়েরজানালেন তার স্বপ্নের কথাও

মৃত্যুর ভিতর দিয়ে সব কিছু শেষ হয়ে যায়, এই কথা মানতে নারাজ জুবায়েরআমার মৃত্যুর পর যদি আমার অপরিচিত দুইটি মানুষও আমার জন্য চোখের জল ফেলে, তবে আমার জন্ম সার্থক। এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়ে চলছেন তিনি

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

More news