রিফাতের ‘অক্ষরগাড়ি’



গল্পটা খুব চেনা। দিনভর বাচ্চাগুলো ভিক্ষাবৃত্তি করে। সন্ধ্যায় ডুবে যায় মাদকের নেশায়। আশেপাশে  বাচ্চাগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার জন্য কেউ নেই। চেনা এই গল্পের শেষে এরকম ভাবেই একদিন পথশিশুরা হারিয়ে যায়। মাদকের কালো অন্ধকারে।

কিন্তু স্রোতের বিপরীত কিছু মানুষ এখনও আছে এই সমাজে। যারা স্বপ্ন দেখে দিনবদলের। হয়ত তারা এই স্বপ্ন দেখেই বলে আমরা নিশ্চিন্তে থাকি!

রিফাত। মিষ্টি হাসির আর চটপটে ছেলেটা এই বিপরীত মানুষের দলেই পড়ে। তার অযুত স্বপ্নের একটি-অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া পথশিশুদের নতুন দিনের আলোর সন্ধান দেওয়া। নতুন করে বাঁচার মন্ত্রণা দেওয়া। 

আমাদের রিফাত


ক্লাস নাইন থেকেই ছেলেটা চিন্তা করত, সমাজের মানুষের জন্য কিছু করতেই হবে। বড় এক ভাইয়ের ‘পিস ফাইন্ডার’ নামের সংগঠনে ছেলেটা ভলান্টিয়ারের কাজ শুরু করল। শীতে কম্বল বিতরণ, অনাথ বাচ্চাদেরকে খাওয়ানো প্রভৃতি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে লাগল। এইসব কাজের ফাঁকে নিজে স্বপ্ন দেখা শুরু করল পথশিশুদের জন্য কিছু করার।

বাবার চাকরির সুবাদে ছেলেটি তখন থাকত কক্সবাজারের চকোরিয়া উপজেলায়। বাবা ছিলেন চকোরিয়ার ডেন্টিস্ট। ম্যাট্রিক পাশ করার পর চলে এলো চট্রগামেনতুন শহর! নতুন মানুষ! কিন্তু ছেলেটার স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয় না! তাই তারই মত কিছু উদ্যমী যুবককে খুঁজে বের করল সেপথশিশুদেরকে অক্ষরজ্ঞান দেবার জন্য প্রতিষ্ঠাতা করল “অক্ষরগাড়ি”। ফেসবুকে পেইজ খোলার পর পাশে পেল “আমজনতা” ও “লাইটার” সংগঠনসহ অন্যান্য অনেক বড় ভাইদের। ২০১৩ সালে ২৪শে অক্টোবর তার সেই স্বপ্ন সত্যি হল। জন্ম নিল ‘অক্ষরগাড়ি’

অক্ষরগাড়ির যাত্রা  


অক্ষরগাড়ির প্রথমদিনের কথা মনে পড়তেই রিফাতের চোখ ঝলমল করে উঠে। বিডিইয়ুথের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সে জানায়, “সেইদিন ছিল স্কুলের প্রথমদিন। এম আই আজিজ স্টেডিয়ামের পাশে বিশাল মাঠে (কাজী দেউড়ি) বাচ্চাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বেলুন উড়ান হয়সেদিন প্রায় ৫০ জন পথশিশু ছিল। মেম্বার হিসেবে আমরা ছিলাম ১২ জন। শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলও আরওঐ ৫০ জনের একজনেরও অক্ষরজ্ঞান ছিল না। তারা ভিক্ষা করত। আমরা তাদের প্রথম অক্ষরজ্ঞান দেওয়া শুরু করি”।

পরদিন থেকেই নিয়মিত আসতে থাকে বাচ্চারা। বাচ্চাদের শেখানোর জন্য নিয়মিত ৩৫ জন ভলান্টিয়ার আছেন। প্রত্যেক বাচ্চার জন্য ৫ থেকে ৬ জন ভলান্টিয়ার থাকে। সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস নেন তারা। শনি, সোম, বুধ।

বাচ্চাদেরকে মজা করে পড়ানো হয় অক্ষরগাড়িতে। বাচ্চারা সরাসরি অক্ষর লেখা শিখতে পারে না। ওদেরকে “অ” লেখা শেখান হয় অন্যভাবে। বলা হয় “একটা গোল দাগ দাও। তারপর জিলাপি প্যাঁচের মত দাগ দাও”। এইভাবে ধরে ধরে বাচ্চাদের শেখায় ভলান্টিয়াররা।

বেশিরভাগ বাচ্চারা ভিক্ষা করেকেউ কেউ বাসের হেল্পার, টং র দোকানে চাওয়ালা প্রভৃতি। ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে তাদের বয়স। ছেলেমেয়েদের মধ্যে মেয়েরা তুলনামূলক কম আসে পড়তেতবে প্রথমদিকে একজন ছেলে ছিল যে ছিল রিফাতদের বয়সে। সেও অক্ষরজ্ঞান নিয়েছিল “অক্ষরগাড়ি” থেকে। অবশ্য পরে ফিরে যায় বাসের হেল্পার জীবনে। শেষ হিসাব অনুযায়ী ৫০ জনের মধ্যে ১৫ জন পথশিশু নিয়মিত আছে অক্ষরগাড়িতে।  

অক্ষরজ্ঞানে পড়াশুনা


কোন নির্দিষ্ট সিলেবাসের আঙ্গিকে পড়ানো হয় না পথশিশুদের। তাদের ভাললাগার জায়গা চিন্তা করে শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে আনন্দদায়ক করা হয়েছেপড়াশুনার জন্য তাদের দেওয়া হয় চক ও স্লেট। “একের ভিতরে সব” বই তাদের মূল পাঠ্যপুস্তকএই একটি বই থেকেই তাদের দেওয়া হয় বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষা।

মাঝে মাঝে বেশ কিছু পরিচিত বড় ভাইয়ারা আসেন অক্ষরগাড়িতে। তারা বাচ্চাদের সঙ্গে বসে হেসেখেলে গান গায়, ড্রয়িং শেখায়, কবিতা মুখস্থ করায়, গল্প বলে আনন্দ দেয় বাচ্চাদের।

প্রত্যেক শুক্রবার চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে একদল ছাত্র-ছাত্রী আসে। তারা অক্ষরগাড়িরই মেম্বার। হবু ডাক্তাররা বাচ্চাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিষয়ক জ্ঞান দেয়। বাচ্চাদের শরীরে একটি রুটিন চেকআপ করে। প্রয়োজনমত ওষুধ দান করে।

অক্ষরগাড়ির অর্থসংস্থান

কোন বিশাল ডোনার বা স্পন্সর নেই অক্ষরগাড়ির পিছনে। ভলান্টিয়াররা মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ চাঁদা তুলে বাচ্চাদের বই, স্লেট, চক এবং সপ্তাহে একদিন খাবারের ব্যবস্থা করে। খাবারের মধ্যে থাকে কলা, কেক, পাউরুটি। অক্ষরগাড়ির প্রথম দিকে অনেক বড় ভাইয়ারা নিজে উপস্থিত থাকতে পারেনি। কিন্তু ঠিকই অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। এইরকম একটা ভাইয়ার নাম জয় ভৌমিক। যিনি জার্মানিতে থাকেন। সেখান থেকে তিনি দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন অক্ষরগাড়ির জন্য।

অবশ্য রিফাতরা এখন ডোনার খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছেনিয়মিত ১৫ জন বাচ্চার মধ্যে ৬ জনকে তারা স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেএই ৬ জন বাচ্চা পড়ালেখায় ভীষণ মনোযোগী এবং তারা মেইনস্ট্রিম বাচ্চাদের সাথে ভালো করবে বলেই রিফাতদের বিশ্বাস।

অক্ষরগাড়ি টিম সমাজকল্যাণ কাজে 


শুধু পুঁথিগত বিদ্যা না, সত্যিকারের শিক্ষা দিতেই বাচ্চাদেরকে সমাজকল্যাণ মূলক কাজে নিয়োজিত করেছে অক্ষরগাড়ি টিম। তাই বাচ্চারা আর ভলান্টিয়াররা মিলে বাঁশখালিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী পালন করেছে। তারা প্রায় ৪০টির মত গাছ রোপণ করেছে ঐ গ্রামে। তাছাড়া অক্ষরগাড়ি টিম যুক্ত আছে রক্তদান কর্মসূচীর সঙ্গে। মানুষের প্রয়োজনে তারা নিজেরা রক্ত দেন এবং ডোনার যোগাড় করে দেন।

অক্ষরগাড়ির বর্তমান

রিফাত এবং তার বন্ধুরা পথশিশুদেরকে আলোকিত করতে গিয়ে কিন্তু নিজেদের প্রধান কর্তব্য একদম ভুলে যায় নি। ২০১৫ সালের জুন মাসের দিকে এইচএসসি পরবর্তী ভর্তি পরীক্ষার জন্য অক্ষরগাড়ির যাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় তারাঅতঃপর রিফাত ভর্তি হয় চট্রগ্রাম সিটি কলেজ, ত্বোয়াহা, রাকিব এবং নাহিয়ান ভর্তি হয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে। ২০১৬ সালে আবার তোড়জোড় করে কাজ শুরু করার বন্দোবস্ত করছেন তারা।

অক্ষরগাড়ির মেম্বার জিসান মাহমুদ বিভিন্ন স্কুলগুলোতে কথা বলছে ৬ জন বাচ্চাকে স্কুলমুখী শিক্ষায় নিয়োজিত করানোর জন্য। এছাড়া স্কুলে বাচ্চারা যাতে নিয়মিত পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারে, তার জন্য নির্দিষ্ট ডোনারও খোঁজ করা হচ্ছে।

সম্প্রতি তরুণদের জন্য নিয়োজিত ইয়াং বাংলা অর্গানাইজেশন কর্তৃক “জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড” পুরস্কারে ভূষিত হয় “অক্ষরগাড়ি টিম”। এই পুরস্কার পাবার ফলে অক্ষরগাড়ির কার্যক্রম আরও বিস্তৃতি হবে বলে মনে করে রিফাত। তাছাড়া ইয়াং বাংলা অর্গানাইজেশনও অক্ষরগাড়ির সঙ্গে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

রিফাতের স্বপ্ন দেশের সবগুলো জেলাতে অক্ষরগাড়ি টিম থাকবেএই স্বপ্নের পেছনে কিছু মানুষের নাম না বললে অন্যায় হয়ে যাবে। তারেক, ত্বোয়াহা, শাওন, এবং দুইজন বড় ভাই পলাশ ও জুয়েল। অক্ষরগাড়ি টিম বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ পলি রহমান, জিসান, শামীমার কাছে।

UNISCO’র হিসাবনুযায়ী বাংলাদেশের বর্তমান নিরক্ষরতার হার ৩৮.৫%। এই নিরক্ষরতা দূর করার জন্য রিফাতদের মত ছেলেদের খুব দরকার এই সময়ে। দরকার হাজার হাজার অক্ষরগাড়ির চলমান যাত্রা। তবেই না আমরা সত্যিকারের দিনবদলের স্বপ্ন দেখতে পারি!

নিজস্ব প্রতিনিধি


More news