শবনম ফারিয়া সুন্দর তার ইচ্ছের মতই



ছোটবেলায় শবনম ফারিয়া অপেক্ষা করতেন কবে জন্মদিন আসবে, আর বাবার কাছ থেকে গিফট চাইতে পারবেন। তখন তার বয়স মাত্র তিন কিংবা চার। সবাই তাকে জিজ্ঞাসা করতো, জন্মদিনে তুমি কি গিফট চাও?

শবনম ফারিয়া তখন টিভির দিকে হাত দেখিয়ে বলতেন আমি ওখানে যেতে চাই। আজ শবনম ফারিয়া সেখানেই, যেখানে ছুটতে চেয়েছিল তার ছোটবেলার আদুরে স্বপ্ন। আজ তার জীবনের সাথে সত্যিই জড়িয়ে গেছে লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন আর কাট্‌-এর খেলা।

তিনি এখন আমাদের টিভি বিনোদনের জনপ্রিয় একজন, আমাদের প্রিয় “শবনম ফারিয়া”।

জার্নি বাই লাইফ...

আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পড়তাম, আমার ক্লাস থাকতো দশটা কিংবা এগারোটাতে। কিন্তু আম্মু তখনো আমাকে ঘুম থেকে উঠাতে পারতো না। আর এখন আমি শুটিং এর জন্য প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। বিজ্ঞাপনের শুট থাকলে দেখা যাচ্ছে পাঁচটাতেও থাকে কলটাইম। সেদিন হয়ত মাঝরাতে শুট শেষ করে এসে আবার পাঁচটায় রেডি হ

কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এর কিছুটা চেষ্টা আমি পড়াশুনায় দিতে পারলে রেজাল্ট আরও ভালো করতাম। যেটা আমি খুব বেশি মিস করি। কারন আমি পড়াশুনা নিয়ে কখনই তেমন সিরিয়াস ছিলাম না। তাই রেজাল্ট খুব একটা ভালো আসেনি। চিটাগং ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজে ভর্তির সময় আর সায়েন্স নেইনি, যাতে বাবা আমাকে ডাক্তার না বানাতে পারে। মানবিকে ভর্তি হয়েছিলাম। মনের মধ্যে প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল সাংবাদিক হবার!


আমার ভালোবাসার মানুষেরা...

উত্তরার একটি শুটিংবাড়িতে বেশ অনেকক্ষণ কথা হচ্ছিল শবনম ফারিয়ার সাথে। সময়ের জনপ্রিয় এই তারকা ইতিমধ্যেই নিজের মেধা দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন সবার মনে। শবনম ফারিয়ার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে এখনো অনেকেই ভিনদেশের রাস্তায় প্ল্যাকার্ড আর ব্যানার নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে থাকে এক নজর সামনে থেকে দেখার।

আর ফেসবুকের লক্ষাধিক ফ্যান ফলোয়াররা তো আছেই। আসতে থাকে হাজার টেক্সট। রিপ্লাই দিতেও চেষ্টা করেন সবসময়। ফ্যানরা জানায় আপু এই ড্রেসটাতে ভালো লাগে, এই কথাটা বেশি ভালো বলেছেন, আপু সামনে কি কাজ করছেন। তাদের ভালোবাসার প্রতিদান কখনো হয় না। চেষ্টা করেন আরও একটু ভালো অভিনয় করে যেতে।  

বলছি আমার সাতকাহন...

অভিনয় ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছুই ভাবনায় নেই। তবে সময় পেলেই চেষ্টা করবেন মাস্টার্সটা শেষ করে ফেলতে। অনুভব করেন বাংলাদেশে ভালো অভিনয় শেখার স্কুলের অভাবের কথা। কার অভিনয় করতে আসলে, এই পড়াশুনাটা শিখে আসা বেশি দরকার। তারপরও অভিনয়ের বই নিয়ে বসে যান সময় পেলেই রাত দুপুরে।

বিশ্ব সিনেমার পোকা বলা চলে শবনম ফারিয়াকে। ডি ক্যাপ্রিও, টম হ্যাঙ্কস, টম ক্রুজ, রবার্ট ডি নিরো সহ পছন্দের তারকাদের তালিকাটা বেশ বড়। রেভেন্যান্ট দেখে ফেলেছেন বেশ কয়েকবার। বেশি ভালো লেগেছে, অভিনয়ের জন্য ডি ক্যাপ্রিওর ডেডিকেশন।

আর বাদ দেন না কোন ব্লকবাস্টার সিনেমাই। আরও বেশি ভালোবাসেন অ্যানিমেশন ফিল্ম দেখতে। আর এভাবেই মুভি দেখে দেখে স্কুলিং চলছে। আর অভিনয়ে আর একটু সহজ হয়েছে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হয়ে। গল্পের গভীরতা সবসময় ছুঁয়ে যায় ফারিয়াকে।   


বইপোকা...

বই পড়ার পোকাটা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বাবাই প্রথম। ছোটবেলায় মাসুদ রানা সিরিজের পোকা ছিলেন শবনম ফারিয়া। আর বড় হয়ে বাদ দেননি হুমায়ুন আহমেদের একটি বইও। স্যার চলে যাওয়ায় অভিমানে বই মেলায়ও যাওয়া হয়না এই মায়াবিনীর। আর পড়াশুনার জন্য তো ওয়েস্টার্ন সাহিত্য পড়তে হয় সবসময়ই।  

সেলেব্রিটি নই তো...

ফারিয়ার এই ছোট সময়ে অর্জন বেশ অনেক। তারপরও নিজেকে কখনোই বলতে পচ্ছন্দ করে না আমি একজন সেলেব্রিটি। কার তার কাছে সেলেব্রিটি হওয়াটা শুধু অভিনয় জানার কিংবা করে যাওয়ার উপর নির্ভর করে না। এর সাথে রয়েছে সময় আর টিকে থাকার এক অদম্য লড়াই।

আরও থাকতে হয় বিশেষ সব গুণ। ফারিয়া বলেন, আমি এখন শুধুই অভিনয় করছি আর বাকি সবকিছু শিখে নেবার চেষ্টা করছিকি সহজে অকপটে বলে ফেললেন! এখন কারো উপর মন খারাপ হলে কিছু বলতে পারেন না।


আমার বাসার ডায়নিং টেবিল...

ভার্চুয়াল লাইফে এত বন্ধুদের ভিড়েও, ব্যক্তিগত জীবনে বন্ধু বেশ কম। এখন রাতে শুট শেষে ফিরতে দেরী হলে মায়ের বকা শুনতে হয়। সকালে একটু খাবার মুখে করে বের হতেই মায়ের হাসি ভরা বকা শুনতে হয়। মা এখনো চিন্তায় থাকে কখন কোথায় কি খাবে। তাই শুটে থাকলেও সবসময় খাবার পাঠিয়ে দেয়।

আবার চেষ্টাও করে এসে কিছুক্ষণ থাকবার। আর ডাক্তার বাবার সাথে খাবার টেবিলে বসে এখনো দেশের গল্প, বইয়ের গল্প, ভালো লাগা মন্দ লাগার গল্প, ক্রিকেটের গল্প, কিছুই বাদ পরে না। পাশাপাশি কয়টা দৃশ্য আজকে ফারিয়া করেছে, কে কে বেশি ভালো করছে আজকাল সব গল্পেই এখনো বাবা।

আর পারিবারিক মধুর খুনসুটির গল্প তো থাকেই। কার ফারিয়ার বাবাই তার আসল অনুপ্রেরণা, সত্যিকার আদর্শ। তাই জীবনে যদি ফারিয়া আবার হারিয়ে ফেলা কিছু একটা পাবার সুযোগ পেয়ে যায়, তাহলে সে সবসময় চাইবে তার বাবার সুস্থ জীবন। বাবাকে অসুস্থ দেখাটা খুবই কষ্ট দেয় ফারিয়াকে।   

সবকিছু গুছিয়েই আসতে চাই সিনেমায়...

খুব গুছিয়ে প্ল্যান করে কাজ করতে পছন্দ করেন শবনম ফারিয়া। তাই ইচ্ছে আছে এ বছর পুরোদমে অভিনয় করে যাবেন। আর পরের বছর থেকে কাজ কমিয়ে একটু ভালো কাজগুলো করার চেষ্টা করবেন। সিনেমার অফার আসে মাঝেমাঝেই। তবে ফারিয়ার প্ল্যান আগামী বছরে ভালো গল্প আর ভালো টিম হলেই সিনেমার জার্নি শুরু করবেন।

কারন ফারিয়া বিশ্বাস করেন নাটক থেকে দুই একজন ছাড়া কেউই সেভাবে ভালো করতে পারেনি সিনেমায় এসে। কার যেখানে দর্শকরা টিভিতে সবাইকে ফ্রি দেখতে পাচ্ছে, তাই আমাকে তখনই সিনেমা হলে টিকিট কেটে দেখতে যাবে, যদি কিনা আমি আরও কিছু অর্জন করতে পারি। তাই সিনেমায় আসার আগে নিজেকে খুব ভালোভাবে প্রস্তুত করতে চা


আহ! কি নিদারু সমুদ্র.........

কাজের ব্যস্ততায় আজকাল পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পারেন না শবনম ফারিয়া। তাই কিছুদিনের আগের মালয়শিয়া ট্যুর তারকাছে সবচেয়ে আনন্দের ছিল। পরিবারের সবার সাথে এত ভালো সময় কাটানো এর আগে হয়নি কখনো। তাই এখনো শত কাজের মাঝে মন উঁকি দেয় মালয়শিয়ার সমুদ্র বিচ। ফারিয়া হাসিমুখে বলতে থাকে, সেই কয়টা দিনে কখনোই অ্যালার্ম দিয়ে উঠতে হয় নি।


আমার সোশ্যাল মিডিয়া ভাবনা...

ফারিয়া সোশ্যাল মিডিয়াকে খুব শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখেন সবসময়। বলেন, এখনো এই মাধ্যমটাতে ব্লাড চাইলে খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে কাউকে ভালো কথা বলে মোটিভেট করা যাচ্ছেসামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ করা যাচ্ছে আর এর পাশাপাশি বন্ধু আর ফ্যানদের সাথে তো একটিভ একটা রিলেশন তো থাকছেই।

তবে মাঝে মাঝে কিছু ইস্যু নিয়ে হয়তো অন্যদের মত ঝামেলায় পড়তে হয়। তবে এটাকে মোটেও সিরিয়াসলি নেন না ফারিয়া। ফারিয়া জানেন এর পরের পোস্টটা আসলে সবাই তখন সেটা নিয়েই বলতে শুরু করবে। আর সবকিছুরই দুটো পক্ষ তৈরি হবে। কেউ সাপোর্ট করবে, কারো ভালো না লাগলে বিরোধিতা করবে। শবনম ফারিয়া চেষ্টা করেন বড়দের কোটস সেভ করে রাখতে।  

অফস্ক্রিনের গল্প...

শবনম ফারিয়া বলেন, আমিও জীবনে অনেক বাজে সময় পার করেছি। কারো জন্য অপেক্ষা করেছি, কেঁদেছি, রাতে ঘুমাতে পারিনি। আসলে এমন করতে গিয়ে দেখতাম আমাকে দিয়ে কিছুই হচ্ছে না। আমি ভেঙ্গে যাইনি। আমি সবসময়ই বিশ্বাস করতাম রিভেঞ্জ হচ্ছে এমন একটা সাইলেন্ট ওয়ার্ড যা কখনোই মুখ দিয়ে বলতে হয় না।

এর চেয়ে করে দেখানোর মত ভালো কাজ আর নেই। আমি তারপর থেকে অপেক্ষায় থাকতাম। কিছু করে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষা। আজ আমি জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো এ জন্যই পার করতে পারছি। আমি বিশ্বাস করি কারো জন্য কখনো জীবন থমকে থাকে না। শুধু নিজেকে প্রমা করতে পারলেই পৃথিবীর কাছে তুমিও হতে পারো অনেক বড় আশীর্বাদ।    


আর আমার জীবনবোধ , আমার স্বপ্নেরা...

শবনম ফারিয়া বিশ্বাস করেন জীবন অনেক ছোট। তাই প্রতিটা সেকেন্ড বাঁচা উচিত সম্পূর্ণভাবে। যাতে কক্ষনো কোন আক্ষেপ ভিতরে আসতে না পারে যে, আমি এটা করতে পারলাম না, এটা হতে পারলাম না। ইচ্ছের জায়গাটাও বেশ আলাদা।

কাজ করতে চান এমনভাবে যাতে একদিন নিজের পরিচয় নিজেকেই দিতে না হয় এবং এত বেশি পরিশ্রম করতে চান যাতে একদিন সবাই তার সিগনেচারকে অটোগ্রাফ বলে। শবনম ফারিয়া আসলেই তার ইচ্ছের মত সুন্দর। আর সেটা তার সাথে সময় কাটানোর সুযোগ পেলে আরও বেশি মনে হবে।

নিজস্ব প্রতিনিধি, ছবি: ফারিয়ার ফেসবুক পেইজ এবং ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত

More news