ভুভুজেলা বিভ্রাট!!!!



বাংলাদেশের সংস্কৃতি নয় ভুভুজেলা। সেটা নাম শুনলেই বোঝা যায়! আরও বিশেষভাবে বলতে গেলে, শহুরে জিনিসও নয়। কিন্তু তবুও গত পাঁচ ছয় বছর ধরে পহেলা বৈশাখের এক আতঙ্ক হয়ে উঠেছে এই ছোট্ট শিঙ্গা জাতীয় বাদ্যযন্ত্রটি।

ভুভুজেলার ইতিহাস

দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে লোক জমায়েতের জন্য ভুভুজেলা বাজিয়ে সবাইকে ডাকা হত। যেমনটা আমাদের দেশে মাইকিংয়ে করা হয়। কিন্তু ভুভুজেলার শব্দ আরও তীক্ষ্ণ। সোয়া দুই ফুটের প্লাস্টিকের এই হর্ন উচ্চস্বরে বিকট শব্দের সৃষ্টি করে।

ভুভুজেলার উৎপত্তি এবং নামকরণ নিয়ে আছে প্রচুর মতবিরোধ। একসময় আফ্রিকার গ্রামে কুডু হর্ন ব্যবহার করা হত। অনেকে মনে করেন ভুভুজেলা সেই কুডু হর্নের বিবর্তিত রূপ। অনেকেই ধারণা করে ভুভুজেলা হচ্ছে জুলু (আফ্রিকার জুলু নামক জাতির ভাষা) শব্দ, যার অর্থ “গোলমাল সৃষ্টি করা”।

ভুভুজেলার জনপ্রিয়তা ও নিষিদ্ধকরণ

দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল মাঠগুলোতে ভুভুজেলার আধিপত্য ছিল প্রথম থেকেই। দেশীয় জিনিস বলে কর্তৃপক্ষও মানা করেনি। তবে শুরু থেকেই ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচগুলোতে সাদরে অভ্যর্থনা পায়নি ভুভুজেলা। ২০০৯ সালে সাউথ আফ্রিকাতে অনুষ্ঠিত  কনফেডারেশন কাপে ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করার জন্য প্রচারণা চালনা হয়। জাপানিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করার দাবি চালায়। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা প্রশাসন নিজ দেশের সংস্কৃতি বলে নিষিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকে।

২০১০ সালে ভুভুজেলার আধিপত্য বেড়ে যায়। নিজ মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে দলে দলে সকলে ভুভুজেলা নিয়ে আসে স্টেডিয়ামে। কান ফেটে যাওয়া সে শব্দে দুষিত হয় পরিবেশ।

ব্রিটিশ মিডিয়া এই খবরকে দারুণভাবে হাইলাইট করে। ভুভুজেলা একজন মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ক্ষতিকারক সেটাই দেখান হয় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে। এবং একসময় বলা হয় বিশ্বকাপের দর্শকদের কানে তুলা গুঁজে স্টেডিয়ামে আসতে। 

গবেষণায় দেখা যায়, ফুল ভলিউমে যখন ভুভুজেলা চালানো হয় তখন তা ১২৭ ডেসিবলকে ছাড়িয়ে যায়। ২০১০ সালে  ইউনিভার্সিটি অফ প্রেটরিয়ার প্রফেসর জেমস হল, ডঃ ড্রিক এবং ডি ওয়েট খুঁজে পান যে, একটা ভুভুজেলা যদি একাধিকবার ১২৭ ডেসিবল শব্দ উৎপন্ন করে তাহলে কানের পর্দা ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি জমায়েতে হাজারখানেক ভুভুজেলার এরকম বিকট শব্দ মানুষের শোনার ক্ষমতাকে একেবারে নষ্ট করে দিতে পারে।

সবদিক বিবেচনা রেখেই ২০১০ সালের শেষের দিকে কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী কেপটাউনের পাবলিক প্লেসে নিষিদ্ধ করা হয় ভুভজেলা! দেশীয় সংস্কৃতির চাইতে মানুষের স্বাস্থ্যের কথাই অবশেষে প্রাধান্য পেল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রশাসনের কাছে। 

বাংলাদেশে এলো ভুভুজেলা

২০১০র পর থেকেই ভুভুজেলা এল আমাদের আউল বাউলের দেশ বাংলাদেশে। রাস্তাঘাটে বিভিন্ন রঙয়ের ভুভুজেলার বিক্রিবাট্টা বাড়তে থাকে, আর ওদিকে পাড়া প্রতিবেশীদের কানের বারোটাও বাজতে থাকে।

২০১০ এর ফুটবল বিশ্বকাপের ভুভুজেলা-উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিলের বিশ্বকাপেও। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ এলেই ভুভুজেলার ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছেতবে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ পরবর্তী ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠল ভুভুজেলা।

২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে মানুষের জমায়াতে কিছু ছেলেরা ইচ্ছে করেই প্রচণ্ড বিকট শব্দে ভুভুজেলা বাজিয়েছিল। তাতে কান ঝালাপালা হয়ে উঠেছিল বৈশাখীমেলার দর্শনার্থীদের। শুধু তাই নয়, মেয়েদের হয়রানির ক্ষেত্রেও ভুভুজেলার বাদকরা ছিল এগিয়ে।

মেয়েদের ভিড়ে বিকট শব্দে ভুভুজেলা বাজিয়ে তাদেরকে উত্যক্ত করা হয়েছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে চলেছিল এ নিয়ে জোরদার প্রতিবাদ! কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই প্রতিবাদের ভাষাও মিইয়ে যায়!

আবার আসছে পহেলা বৈশাখ! গত পাঁচ ছয় বছর ধরে মাত্রা বাড়ছে ভুভুজেলা ব্যবহারের। আগে যেখানে বৈশাখকে মানুষ বরণ করত বাঁশির সুর দিয়ে, সেই জায়গা করে নিয়েছে বিজাতীয় ভুভুজেলা। আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক এবং নিপীড়নদায়ক এই ভুভুজেলা আমাদের দেশে নিষিদ্ধ করাটা এখন সময়ের দাবী।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত


More news