হোলি হে... দিনটা ওদের জন্য একটু বেশিই স্পেশাল



দোস্ত, কাল তো হোলি? এইবার যাবি না পুরান ঢাকায়? আমাকে নিয়া যাইস! কতবার করে বলতেছি তোদের নিয়া যাইতে, এইবার বাসা থেকেও পারমিশন দিসে...

আবীরকে হোলিতে নিয়ে যাবার জন্য বারবার ফোন করছে বাড্ডা থেকে পৃথ্বী। ওর খুব শখ পুরানো ঢাকায় সবার সাথে একবার হোলিতে যাবেই। এর আগে সবসময় বন্ধুদের হোলিতে নাচানাচি করার পিকচার দেখছে আর মন খারাপ করে বসে থেকেছে।  

কিন্তু আবীরের সমস্যা অন্য কোথাও। ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। একদিকে স্কুলফ্রেন্ডরা বলছে জয়েন করতে, কলেজের গ্রুপও বলছে। আবার মাত্র ইউনিভার্সিটিতে উঠায় সেখানেও সবাই মিলে প্লান করে বসে আছে। আর এলাকার বন্ধুরা তো ভাবতেই পারে না আবীর অন্যদের সাথে জয়েন করবে। আবীর, পৃথ্বীকে বুঝানোর চেষ্টা করে দোস্ত, আমার নিজেরই ঠিক নাই কাদের সাথে যাবো, তোকে কি করে কথা দেই।   

এইদিকে উত্তরার রুদ্রদের প্লান আরও একমাস আগে থেকেই। এমন ইভেন্ট কখনোই মিস করে না ওরা। ফেসবুকে দুইমাস আগেই একটা সিক্রেট গ্রুপ ওপেন করেছিল। সেখানে পঞ্চাশ জনের মত রেগুলার একটিভ থাকতো। আর প্লানগুলোও সব সেখানেই।

কে কে যাচ্ছে, কোথায় এসে দাঁড়াবে। কেউ বলছিল তাঁতিবাজারে ঢোকার মুখে দাঁড়াবে, আবার কেউ বলছিল জর্জকোর্ট এর সামনে। অবশেষে সবাই মিলে জর্জকোর্ট এর সামনেই থাকবে সকাল দশটায়। পঞ্চাশজনের এই টিমে আছে দশজন ফটোগ্রাফার। হোলিতে রঙ খেলবে আর ছবি তুলবে না তাই কি হয়!

কিন্তু এই ছবি নিয়েই যত বিপত্তি। গত বছর হোলি শেষে একটা ছবি খুব ভাইরাল হয়েছিল। একটা বাচ্চা ছেলে হোলির রঙের সাথে নিজের পি মিশাচ্ছিল আর সেই রঙমাখা পানি সবার দিকে ছুড়ছিল। এমন সব ছবি নিয়ে রয়েছে বিতর্কও। লালমাটিয়ার শায়েনা যেতে চাচ্ছে না এই ছবির জন্যই।

কিন্তু শায়েনার বন্ধুরা নাছোড় বান্দা। বারবার করে বোঝানোর চেষ্টা করছে এমন ছবি আসলে ফটোগ্রাফাররা জনপ্রিয়তা পাবার জন্য তুলে থাকে। নিজেদের জায়গাতে কেউ এভাবে করে থাকে না। তাহলে তো আর ওদের ওখানে কেউ যাবে না হোলি খেলতে। এটা ওরা বুঝে। শায়েনা তারপরও একটু কনফিউজ।  

তবে শায়েনার চেয়ে আরও কনফিউজ ধানমন্ডির রাইসা। গতবার ও গিয়েছিল বন্ধুদের সাথে প্রথমবারের মত। কিন্তু এত ভিড় আর ধাক্কাধাক্কিতে শুরুতেই ওর অস্বস্তি লাগতে শুরু করে। পাশের বেস্ট ফ্রেন্ড লাবিবকে ধরে একটু একটু করে ভিতরের দিকে যাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু একজনের পর একজন এসে গালে জোর করে রঙ মাখিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। এটা একদমই ভালো লাগেনি রাইসার।

তাই লাবিবকে নিয়ে বের হয়ে আসছিল রাইসা। রাইসা মনে করে ছবিতে হোলি যেমন দেখাচ্ছিল তা সামনে থেকে আরও আলাদা। এত ভিড় আর কিছু আনব্যালেন্সড মানুষ ঠেলে, মজা করে আসা তার পক্ষে সম্ভব না। লাবিব এখনো বুঝিয়ে যাচ্ছে আরে এটা ঐতিহ্য। একে অন্যের গালে রঙ মাখানোই হোলিতে রঙ খেলার সার্থকতা।

কমলাপুরের জারিফ আর ইশানা বুঝতে পারছে না কি করবে। বন্ধুদের সাথে এলাকায় রঙ খেলবে নাকি শাঁখারিবাজার যাবে। এইদিকে গতকালই শাঁখারিবাজার থেকে রঙ, পিচকারি সহ সবকিছুই কিনে এনেছে সবাই মিলে। সাউন্ড সিস্টেমও বলা হয়ে গিয়েছে। প্ল্যান নিজেদের এলাকায় বসেই হোলি খেলা। জারিফ এলাকাতে বসে হোলি খেলতে চাইলেও ইশানা চাইছে না। সেখানে ওর আরও বন্ধুরা আসবে। সবাই মিলে হোলি খেলার মজাই আলাদা।

অবন্তির সাথে হোলি খেলতে এসেই পরিচয় প্রদীপের। হোলির দিনে হটাৎ মেয়েটা এসে গালে রঙ মেখে দিল প্রদীপের। ফিরে তাকাতেই দেখে মুচকি হাসছে সে। তারপর বলে উঠলো হ্যাপী হোলি দোস্ত। আমি অবন্তি। দোস্ত শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খায় প্রদীপ। পরে অবন্তি বলে সরি আমি ভাবছিলাম আমার বন্ধু রাতুল। কিছু মনে করবেন না।

কিন্তু সেই হাসি প্রদীপ ভুলতে পারেনি। হ্যাপি হোলি লিখে যারা যারা ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ করে পোস্ট করে সবাইকে খুঁজতে থাকে। হঠাৎ খুঁজে পায় হাসি ভরা অবন্তিকে। বন্ধু রিকোয়েস্ট আর তার কিছুদিন পরেই প্রেম। সেই থেকে হোলিতে একসাথে আসে। হোলি ওদের জন্য সবচেয়ে বেশী স্পেশাল উৎসব  

হোলি এখন আর শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীর উৎসব নয়। এটা এখন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব। এটা এখন রঙ দিয়ে পৃথিবীকে আরও সত্য সুন্দর করে তোলার উৎসব। তাই যখন বছর ঘুরে আবারো যখন হোলি আসে তখন মনে লাগে বাড়তি রঙ। আর সেই রঙই হয়তো মিশে যায় সবখানে। মিশে থাকে সব প্রাণ

হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের পৌরাণিক জন্মভূমি উত্তর ভারতের মথুরায় হোলির উৎসব চলে ১৬ দিন ধরে৷ ভারতের উত্তর প্রদেশের বার্সানায় একটু অন্যরকমভাবে হোলি উদযাপিত হয় সেখানকার পুরুষরা নারীর উদ্দেশ্যে উসকানিমূলক গান গায়৷

আর প্রতীকিভাবে তাতে উত্যক্ত হয়ে লাঠি দিয়ে পুরুষদের মারার চেষ্টা করেন নারীরা আর আমাদের দেশেও সবাই আলাদা করে বাসায় পালন করলেও পুরনো ঢাকার শাঁখারিবাজার আর তাঁতিবাজার এলাকা একটু বেশীই আলাদা আর উৎসবময়।

হোলি খেলতে যা কিছু মনে রাখা দরকার:

রঙ খেলার পূর্বে গায়ে অলিভওয়েল অথবা গ্লিসারিন মেখে নেওয়া ভালো এতে করে রঙ তাড়াতাড়ি উঠে যায় যাদের ডাস্ট এলার্জি এবং ভেজা কাপড়ে থাকলে ঠাণ্ডা লেগে যায় তাদের জন্য না যাওয়াই উত্তম ফটোগ্রাফাররা আগে থেকেই পলিথিন, লেন্স ক্যাপ এবং আরও দরকারি অনুষঙ্গ দিয়ে ক্যামেরা ঢেকে নিয়ে যেতে পারেন না হলে রঙ আর পানিতে নষ্ট হয়ে যাবে আপনার মূল্যবান ক্যামেরা

একটু দামী ফোন না নিয়ে যাওয়াই উত্তম কারণ সেটা যেমনি রাখার জায়গা নেই তেমনি হারানোর বা পানিতে নষ্ট হবার সম্ভাবনা বেশি পুরোনো কাপড় পরে যাওয়াই ভালো, কারণ নতুন কাপড় রঙ লেগে নষ্ট হয়ে যাবে

বন্ধুদের সাথে আগে থেকেই কথা বলে রিপোর্টিং প্লেস এবং সময় ঠিক করে রাখতে হবে না হলে এত ভিড়ে কাউকে খুঁজে পাওয়া অনেক কঠিন সবাইকে লাইন ধরে হাঁটতে কিংবা থাকতে বলা ভালো এতে এদিকে সেদিকে হারানোর সম্ভাবনা কম থাকে

লোকজন এসে রঙ মেখে দিতে চাইলে যদি অস্বস্তি লাগে, তাহলে আর ভিতরের দিকে প্রবেশ না করাই উত্তম হোলির জন্য হলুদ আর জাফরানের ফুল পাতা থেকে রং তৈরি হলেও অর্গানিক রঙ কেনা ভালো কারণ এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো

নিজস্ব প্রতিনিধি


More news