ইউল্যাবের সাবিত: স্বপ্ন আর ভালবাসায় শুধুই ক্রিকেট



সাবিত হোসাইন। জন্ম বগুড়াতে জন্মের পর থেকেই অ্যাথলেটিকস, ডিসিপ্লিন, ফিটনেস, রাফ এন্ড টাফ ইত্যাদি শব্দগুলোর সাথে পরিচিতি তার। বাবা ছিলেন তখনকার সময়ের প্রফেশনাল ফুটবলার। এমনকি চাচা এবং দাদা সবাই খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলেন। পরিবারের এমন আবহের কারণেই হয়তো অ্যাবস্ট্রাক্ট হিসেবে শোনা শব্দগুলোর প্রতিই তার প্রথম ভালবাসা জন্মায়। তাই সাবিত নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকে, খাকি রংয়ের ড্রেস পরিহিত আর্মি অফিসার হিসেবে!!

সাবিতের এমন স্বপ্নগুলো নিয়েই জম্পেশ আড্ডা জমে যায় বিডি ইয়ুথ এর সাথে... 

আর্মি অফিসার থেকে ফুটবলার!!

উপযুক্ত বয়সের অভাবে তখনও আর্মি অফিসার হওয়ার স্বপ্নযাত্রা শুরুই হয়নি সাবিতের। রক্তের সাথে মিশে আছে, তাই হয়তো সাবিত তখন ফুটবলটা খুব ভাল খেলত। স্কুলে থাকতেই বগুড়ায় সেকেন্ড ডিভিশন পর্যন্ত ফুটবল খেলা হয় তার। তখন পর্যন্ত সাবিত কিন্তু ফুটবলার!!

ফুটবল থেকে হঠাৎ ক্রিকেট!!


 

সাবিত যখন ক্লাস ফাইভে তখন হঠাৎ বগুড়ায় ইন্টার স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হয়। তাতে সাবিতের স্কুল থেকে ক্রিকেট টিমের যে লিস্ট দেওয়া হয় সেখানে সাবিতের নামও দেওয়া হয়। কারণ সবাই জানতো সে ফুটবল খেললেও টেপ টেনিসে ক্রিকেটও মোটামুটি খারাপ খেলতো না

ইন্টার স্কুলের প্রথম ম্যাচ তার জন্য ছিল ক্রিকেট বলে খেলা প্রথম কোন ম্যাচ তাও আবার এত বড় টুর্নামেন্টে!! আর এই প্রথম ম্যাচটাই তার জীবনের লক্ষ্যকে পুরোপুরি বদলে দেয়সাবিত ৫১ রান করে দলকে জিতিয়ে দেয়!! এর পরে ইন্টার স্কুল টুর্নামেন্টে মোট পাঁচ ম্যাচের মধ্যে তিনটাতেই ছিল তার হাফ সেঞ্চুরি!!

ক্রিকেটের স্বপ্নযাত্রা


জীবনের প্রথম ক্রিকেট টুর্নামেন্টে এত ভাল করায় সবার মতো সাবিতও আবাক সাবিতের রক্তে যেন দানা বাঁধতে লাগলো ক্রিকেট। সারাদিন আর রাত জেগে ক্রিকেট খেলা দেখা শুরু হলোআর সুযোগ পেলেই মাকে বলত যে, “তার স্বপ্ন অনেক বড় স্টেডিয়ামে ক্রিকেট খেলা।

যেখানে অনেক মানুষ দেখবে তার খেলা, ভাল করলে অনেক মানুষ এক সাথে তালি দেবে”প্রায় প্রতিদিনই মা’র সাথে ঘুমানোর সময় মাকে নিজের স্বপ্নের কথা বলত সে। শুনে মা’ও তার স্বপ্ন দেখায় আরো উৎসাহ দিতেন।

সাবিত যখন ক্লাস সিক্সের শেষ সময়ে, মা হঠাৎ না ফেরার দেশে চলে যান। এর কিছুদিন পরেই বাবা (ডা. মো. সামির হোসেন) তাকে ডেকে বললেন, “বিকেএসপি’তে এক দিনের ট্রায়াল নিচ্ছে। তোমার আম্মুর ইচ্ছা ছিল তুমি ক্রিকেট খেল। বাকিটা তোমার কি ইচ্ছা।” আর এরপরে সাবিতের ইচ্ছার কথা তো আমরা আগেই জেনে গেছি

বিকেএসপি’তে পথচলা


 

বাবার সাথে সাভারের বিশাল বিকেএসপি’তে আসে সাবিত। ক্রিকেটের ট্রায়াল এবং বিভিন্ন পরীক্ষার পর এবার আসে রেজাল্ট প্রকাশের পালা। সেদিন বেশ একটা মজার ঘটনাও ঘটেনোটিস বোর্ডে নিজের নাম খুঁজতে গিয়ে সাবিত ধরেই নিয়েছিল যে, তার নাম থাকলেও শেষের দিকেই থাকবে। তাই প্রথম পৃষ্ঠা বাদ দিয়েই বাকিগুলো দেখে সাবিত মন খারাপ করে বাবাকে গিয়ে বললো, সে মনে হয় সিলেক্ট হয়নি!

বাবা তখন জিজ্ঞেস করেন, “প্রথম থেকে দেখা হয়েছে? যা ভাল করে প্রথম থেকে আবার দেখ” বাবার কথা মত প্রথম থেকে চেক করতে গিয়ে সাবিত পুরাই অবাক!! সাবিত হোসাইন নামটি একেবারে এক নম্বরে রয়েছে, এবং বিকেএসপি’তে সে সারা বাংলাদেশের ৫০০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৬% পেয়ে প্রথম হয়েছে!!!

বিকেএসপি’তে বীর দর্পে সিলেক্ট হওয়ার পর সাবিতের আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। বিকেএসপি’তে থাকার সময় একে একে খেলা হয় বগুড়া জেলার হয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ সহ রাজশাহী ডিভিশনও। অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্ট জয়ে ভূমিকা রাখে তার ব্যক্তিগত একাধিক হাফ সেঞ্চুরি। ভালই চলছিল সব কিছুবিকেএসপি থেকেই এস এস সি পরীক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েকবছর পরই তার সাথে ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা!!

স্বপ্নভঙ্গের গল্প


 

বিকেএসপি’তে অনূর্ধ্ব-১৯ এর ট্রায়াল চলছিল তখন। সাবিত তার প্রাকটিস শেষ করে মাঠের পাশ দিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলো মাঠে তখন একটা ম্যাচ চলছিল। হঠাৎ করে উড়ে আসা একটি ওভার বাউন্ডারি ঠিক তার ঘাড়ে এসে লাগে। সাথে সাথেই তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায় এবং সেই সাথে অনূর্ধ্ব-১৯ খেলার স্বপ্নও!!  

এক মাসেরও বেশি সময় ইনজুরিতে বসে থেকে সাবিতের মনোবলও হ্রাস পেতে থাকে। সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও নিয়মিত প্রাকটিসে যেতেও তার অনিহা এসে পড়ে। যার ফলাফল, কোচদের কাছে অপছন্দের পাত্রে পরিণত হওয়া। ঠিক তখনই শুরু হয় বিকেএসপি’র ইনডোর ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এই টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রান করে কোচদের অবাক করলো সাবিত। তবে সাবিতের ধারণা, আগেই কোচদের চোখে অলস ছাত্র উপাধি পাওয়াতে তার সেই সর্বোচ্চ রান কাজে দেয়নি।

অতঃপর সময় এসে পড়ে এইচ এস সি পরীক্ষার। বিকেএসপি থেকেই পরীক্ষার পর সাবিত খেলতে শুরু করে ঢাকার ডিভিশন পর্যায়ের ক্রিকেট। কিন্তু আস্তে আস্তে অনেক ম্যাচে ভাল-মন্দ পারফর্মেন্স করে খেলতে খেলতে এক সময় সাবিতের মানসিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। যাকে আমরা ডিপ্রেশন হিসেবে জানি।

নতুন সাবিতের খোঁজ!!


 

নানা রকম চিন্তা তার মাথায় এসে ভর করে। এক সময় আরো অলস হতে থাকে, রুটিন লাইফে চলা সাবিতের সব কিছু ওলট-পালট হতে থাকে। যা থেকে বের হতে তাকে দেবদূতের মত এসে সাহায্য করে মাইশুকুর রহমান রিয়েল ভাই। এই মানুষটা তাকে নানাভাবে উৎসাহ দিতে থাকেন।

রিয়েল ভাইয়ের অনুপ্রেরণা আর বন্ধু রাফির পরামর্শে ইউল্যাবে মিডিয়া স্টাডিজ এন্ড জার্নালিজম এ ভর্তি হয়ে সাবিতের জীবন নতুন মোড় নেয়। ক্রিকেটের পাশাপাশি সাবিতের আগে থেকেই সৃজনশীল কাজে আগ্রহ ছিল। তাই ইউল্যাব এর এই ডিপার্টমেন্টকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয় সে। পাশাপাশি নাম লেখায় ইউল্যাব ক্রিকেট টিমে

এর পরে সাবিত ফিরে পায় ক্রিকেট নিয়ে তার আগের উন্মাদনা ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাকটিসে। কঠিন পরিশ্রমের ফলাফল হিসেবে ক’দিন আগেই ইউল্যাব টিমের হয়ে জিতে নেয় ইউল্যাব ফেয়ার প্লে কাপ। যেখানে বেশ কিছু ম্যাচে অসাধারণ উইকেট কিপিংয়ের নৈপুণ্য দেখিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা ফিল্ডার ট্রফি নিজের করে নে সাবিত

সাবিতের এখন স্বপ্ন অথবা টার্গেট একটাই। নিজেকে জাতীয় দলের একজন হিসেবে দেখা। একদিন সারা দেশের মানুষ তার খেলা দেখে তালি দিবে (তার মাকে সে যেমনটা বলতো!!) তার আগে অবশ্যই ঢাকা লিগে নিজের যোগ্যতা দেখাতে হবে তারআর সাথে সাথে ইউল্যাব এর হয়েও ভাল খেলা উপহার দেওয়া।

অনুপ্রেরণা যোগায় যারা


বন্ধু রাফি, রিয়েল ভাই এবং সবার আগে বাবার অনুপ্রেরণা আর পাশে থাকার কারণেই আবার ফর্ম এসেছে বলে তার বিশ্বাস। এর সাথে ইউল্যাব ক্রিকেট টিমের কথা বলে সাবিতদলের সদস্যদের এবং ক্যাপ্টেনের কথাও স্মরণ করে সে

ব্যাটিংয়ে সাবিত সবসময় ভিরাট কোহলিকে অনুসরণ করে বলে জানায়। শুধুমাত্র তার ব্যাটিংকেই অনুসরণ করে, কারণ ভিরাট একজন সময়োপযোগী ব্যাটসম্যানআর কিপিংয়ে সাঙ্গাকারা এবং মুশফিকুর রহিমকে অনুসরণ করেএমনকি মুশফিকুর রহিম ভাইয়ের কাছ থেকে মাঝে মাঝে অনেক পরামর্শও নিয়ে থাকে বলে জানায় সাবিত।

তরুণদের প্রতি সাবিত


জীবনে নানারকম ভাল সময় আর খারাপ সময় আসে। তখন ধৈর্য ধরে নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখার উপরেই পরবর্তী ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। একজন ভাল ক্রিকেটার হতে হলে তাকে অবশ্যই কঠিন পরিশ্রম করার শপথ করতে হবে। রাতে ঠিক মতো ঘুমানোর কথাও বলে সাবিত। মজা করে সাবিত তার পরামর্শ দেয়, “প্রেম করলেও যেন সবাই প্রাকটিকাল থাকে। এর উপরেই যেন সকল সময় ব্যয় না করে।”

মজা করে বললেও সাবিত এই কথাটাকে খুবই গুরুত্ব সহকারে নিতে বলেহয়তো কষ্টের ফল সাথে সাথে পাওয়া যায় না কিন্তু সাধনা করলে অবশ্যই মানুষ তার লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। অযথা সময় নষ্ট করলে পরে নিজেকেই পস্তাতে হয় বলে হুঁশিয়ার করলো সাবিত

সব শেষে বিডি ইয়ুথ’কে সাবিত তার আক্ষেপের কথা জানান, “ঢাকায় খেলার জন্য তেমন কোন উপযুক্ত মাঠ নেইযারা ক্রিকেটার হতে চায় তাদের জন্য উপযুক্ত মাঠের খুবই অভাব। শুধু ক্রিকেট নয়, যে কোন খেলাধুলার জন্যই মাঠের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাল মাঠ না থাকলে কোন খেলার এবং খেলোয়াড়েরই বিকাশ হবে না।

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


More news