ভার্চুয়াল রিয়েলিটিঃ বাস্তবতা যেখানে Made of Technology



কফির মগ হাতে খুব ইচ্ছে করছে সমুদ্র দেখার! কিংবা এখুনি ইচ্ছে করছে কোন প্রিয় তারকার সঙ্গে হাতে হাত রেখে গল্প করার! কাঠফাটা রোদে কোথায় সেই সমুদ্র! কিংবা লাইমলাইটের আলোয় থাকা সেই তারকা তো সবসময়ই দুরের গ্রহ!

কিন্তু এমন যদি হয়, নিমিষেই তোমার বারান্দাটা হয়ে গেল সমুদ্রের নিকটতম বেলাভূমি! কিংবা তোমার অন্ধকার ঘর হয়ে উঠল জ্বলজ্বলে কোন রঙ্গমঞ্চ! হতে পারে কি?

টেকনোলজি আশীর্বাদ না অভিশাপ সে তর্ক রেখে, যদি তোমায় বলা হয় এমন এক বাস্তবের গল্প যেখানে তুমি চাইলেই সমুদ্র পাবেচাইলেই পাবে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি! তুমি কি সেই বাস্তব চাইবে না! হতে পারে সেই বাস্তব তোমাকে সমুদ্রের জল ছুঁতে দিবে না, পারবে না বৃষ্টিতে ভেজাতে। কিন্তু সমুদ্রপাড়ের অনুভূতি তো তোমাকে এনে দিতে পারবে! সেও কম কি!

কয়েক দশকের বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফল ‘ভার্চুয়াল রিয়েলিটি’বাস্তবতা সেখানে মেড অফ টেকনোলজি। তাই সেই “বাস্তব” Really “রিয়েল” না, virtually ‘রিয়েল’। টেকনোলজির হাজারো মারপ্যাঁচ দিয়ে সেখানে বাস্তব তৈরি করা হবে ইউজারের জন্য। ইউজার সেই বাস্তবতার ঘ্রাণ, অনুভূতি সব পাবে! শুধু ইউজারকে পরে নিতে হবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কিছু নির্দিষ্ট হেডসেট।

সময় ২০১৬ সাল

সম্প্রতি বলা হচ্ছে ২০১৬ সালটা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির জন্য এক স্মরণীয় বছর হবে। বিশ্বের তাবৎ বড় বড় টেক কোম্পানি যেমন: গুগল, ফেসবুক, অকিউলাস, এইচটিসি, সনি, স্যামসাং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সংক্রান্ত বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

২৫০টা এরকম টেক কোম্পানি প্রায় ৪ বিলিয়নের মত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব কোম্পানির ডিজাইনার, ডেভেলপাররা স্বপ্ন দেখছে এমন এক ভবিষ্যতের যেখানে মানুষ হেডসেট পরে বিচরণ করবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির জগতে।

কখন আসছে সেই বাস্তবতা?

৮০ বা ৯০ সালের দিকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে জোরদার কাজ শুরু হয়। কিন্তু মানুষ এটাতে অভ্যস্ত হবে না বলে মার্কেটে আনার কোন চিন্তাই করেননি বড় বড় ব্যবসায়ীরা! কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়েলিটি তখন জায়গা করে নিয়েছিল মিলিটারি এবং একাডেমিক রিসার্চে।

ধীরে ধীরে একাডেমিক পড়াশুনার ফলে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠে এই নতুন টার্মের সঙ্গেঅবশেষে এখন মানুষ পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই টার্মের সঙ্গে। সময় খালি মানুষের জীবনযাপনে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রবেশ করার।

বিশ্বব্যাপী ২০০ হাজার ডেভেলপার এবং ৭০০ এর বেশি স্টার্ট-আপ কোম্পানি কাজ করে যাচ্ছে এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে। তবে খুব ধীরে ধীরে মানুষকে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তাই টেক দুনিয়ার বড় বড় কোম্পানি চিন্তা করেছে ছোট ছোট এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে শুরু হবে স্বাভাবিক জীবনে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির যাত্রা।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির হেডসেট বাজারে, যেতে হবে আরও দূর

গত তিনবছর ধরে মার্কেটে বিভিন্ন ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কিট(KIT) পাওয়া যেত। এর মধ্যে ছিল Head Mounted Deviceকিন্তু এগুলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটির নির্দিষ্ট হেডসেটের ধারের কাছেও কিছু না। প্রথম পরিপূর্ণ হেডসেট মার্কেটে এনেছিল এইচটিসি টেক কোম্পানি। হেডসেট ছাড়া ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কোন অস্তিত্ব নেই।

কারণ ঐ হেডসেট পরেই মানুষ অনুভূতি পাবে বানানো বাস্তবের। এইচটিসি ছাড়াও অকিউলাস, ভাল্ভ এবং সনি বাজারে এনেছে নানান ধরনের ভার্চুয়াল রিয়েলিটির হেডসেটমূলত স্বাভাবিক চোখের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে এই হেডসেটগুলো। তাই এগুলোকে আরও শক্তপোক্ত করার জন্য অনেক গবেষণার প্রয়োজন।

মোবাইলে প্রথম

ডেক্সটপ বা ল্যাপটপ না, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রথম দখল করবে মোবাইলকে। মোবাইলের মাধ্যমে খুব কম টাকায় মানুষ ভার্চুয়াল রিয়েলিটিকে উপভোগ করতে পারবে। এতে করে ৫ মিলিয়ন মানুষের কাছে প্রথম ধাপেই পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটির গেম খেলতে পিসি ইউজারদের প্লেস্টেশন কেনা প্রয়োজন। তাতে ৪০০ ডলারের মত খরচ হবে। অথচ মোবাইলে সে একই গেম খেলতে খরচ হবে মাত্র ১০০ ডলার।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা

অনেকেই মনে করেন ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কেবলমাত্র গেম এবং বিনোদনের জন্য। এটা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। হ্যাঁ এটা ঠিক, গেমের স্টোরিকে অনেক বেশি জীবন্ত করে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। কিন্তু এই জীবন্ত করে তোলার প্রক্রিয়া কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, ডিজাইনকেও কম প্রভাবিত করে না।

ধরো তোমাকে ক্লাসে হার্ট পড়ান হচ্ছে। এখন যদি পরিবেশটা এমন হয়, কোন জীবন্ত হার্ট তার রক্ত চলাচলের খুঁটিনাটি তোমাকে দেখিয়ে দিচ্ছে! ব্যাপারটা কেমন হবে? তোমার কি আর বই পড়ার দরকার হবে রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া জানার জন্য? ভার্চুয়াল রিয়েলিটি জীবনকে এভাবেই সহজ করে তুলবে

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং গ্লোবাল ভিলেজ

ছয় মাস ধরে সানফ্রান্সিসকো উপকূলীয় জায়গায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির কার্যক্রম নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। লস এঞ্জেলস, সিয়াটল, টোকিও,প্যারিস, বার্সেলোনা, লন্ডন, নিউজিল্যান্ড, চায়নার মত বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোর বিখ্যাত কোম্পানিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মুভমেন্টের কাজে। সারা বিশ্বকে এক করেছে এই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি।

আসলে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি মানুষের জীবনে জায়গা করে নিতে পারবে কিনা তা কেবল নির্ভর করে কিভাবে মানুষ একে গ্রহণ করবে! আদৌ খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা! যেদিন সত্যিকার বাস্তবের মত মানুষও বিশ্বাস করতে শুরু করবে ভার্চুয়াল বাস্তবকে, সেদিনই জয়যাত্রা শুরু হবে ভার্চুয়াল রিয়েলিটির!

যে বাস্তবতার ধারে কাছে যেতে পারার সম্ভাবনা নেই আমাদের, সেই বাস্তবতাই প্রয়োজন মাফিক আর কদিন পর বানিয়ে দিবে টেকনোলজি। জীবনের অতৃপ্তি তো কম না আমাদের! মানব জীবনে কিছু অতৃপ্তি নাহয় টেকনোলজিই ঘুচাল! দোষ কি?

ভেনচার বিট ব্লগ এবং উইকিপিডিয়া অবলম্বনে, ছবি: ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত

More news