ঢাবি’র রায়হান: বিতর্ক আমাকে আত্মবিশ্বাসী করেছে



ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আবু রায়হান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সংসদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক এবং একজন কৃতী বিতার্কিক। আজ তরুণ বিতার্কিক রায়হানের সাথে তর্ক-বিতর্ক করবে বিডি ইয়ুথ!! কথা বলবে বিতর্ক অঙ্গনে তার পথচলা এবং বিতর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে...।

বিডি ইয়ুথ: দীর্ঘদিন থেকে বিতর্কের সাথে জড়িত আছেনকিভাবে যুক্ত হলেন বিতর্কের সাথে?

আমার স্কুল ও কলেজে আসলে ফরমাল কোন বিতর্ক হতো নাযেটা হতো সেটা হচ্ছে ‘উপস্থিত বক্তৃতা’। বিতর্কে আসার আগে আমি স্কুল ও কলেজে উপস্থিত বক্তৃতায় অংশগ্রহণ করতাম অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় একবার জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হই।

সেসময় বিটিভিতে নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা হতোওগুলো দেখে তখন ভাবতাম, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবো তখন আমিও বিতর্ক করবো। তখন থেকেই মূলত বিতর্কের প্রতি একটা আগ্রহ জন্মায়। তবে, ফরমাল যে বিতর্ক সেটা করার সুযোগ পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরে।

বিডি ইয়ুথ: কিভাবে সুযোগটা আসলো?

১ম বর্ষে ভর্তি হবার পর জিয়া হলে উঠি। হলের নোটিশ বোর্ডে জিয়া হল ডিবেটিং সোসাইটির নোটিশ দেখে সেখানে যাই। প্রথম দিকে শুধু বড় ভাইদের বিতর্ক দেখতামপরে একদিন বড় ভাইরা একটা টপিকের ওপর বলার জন্য সামনে ডাকলেন। ঐদিন আমার উপস্থাপনার প্রশংসা করেন ভাইয়ারা এরপর থেকে হলে নিয়মিত বিতর্ক চর্চা শুরু করি

বিডি ইয়ুথ: বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে কবে থেকে, কিভাবে ফরমাল বিতর্কের সুযোগ পেলেন?


 

বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে হলের হয়ে ফরমাল বিতর্কের সুযোগ পেতেই আমার দেড় বছর লেগেছিল  দ্বিতীয় বর্ষে হলের হয়ে বিতর্ক করার সুযোগ পাই। হলের হয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক করে যাইসর্বপ্রথম সাফল্য পাই ২০১২ সালে পপুলেশন সাইন্স বিভাগ ও UNFPA এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আন্তঃহল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় রানার-আপ হই

এরপর আরো বড় প্লাটফর্ম পাওয়ার জন্য ‘DUDS’এ যাতায়াত শুরু করি এখান থেকেই ২০১৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমবারের মতো প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে অংশগ্রহণ করি সেবার। তারপর থেকে নিয়মিতই বিতর্ক করতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে।

বিডি ইয়ুথ: অনেক জায়গায়, অনেক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় কোনটি?

স্মরণীয় তো অনেকগুলোই আছেতবু বিশেষভাবে মনে থাকবে ২০১৪ সালে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও বিটিভি আয়োজিত আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার কথা। আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম এবং আমি শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হয়েছিলাম

বিডি ইয়ুথ: আপনি তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সংসদের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক। এই নেতৃত্বে আসলেন কিভাবে?

বিতর্ক করতে করতেই এক সময় মনে হলো এবার নতুনদের সুযোগ করে দিয়ে নেতৃত্বে যাওয়া উচিত। ২০১৪ সালে আমি জিয়া হল ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি হই। ঐ একই বছর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সংসদের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। আর এর এক বছর পরেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক সংসদের(DUDS) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই।

বিডি ইয়ুথ: বিতার্কিক আবু রায়হান আর সাধারণ সম্পাদক আবু রায়হানের মধ্যে পার্থক্য কি?


দুই জনের ভূমিকা দুই রকম। আগে যখন শুধু বিতার্কিক ছিলাম তখন আমার কাজ ছিল বিতর্ক চর্চা করা, বিতর্কে অংশগ্রহণ করা। কিন্তু এখন আমার ভূমিকা সম্পূর্ণ আলাদা। এখন আমার মূল কাজ হচ্ছে নতুন বিতার্কিক তৈরি করা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক বিতর্কের আয়োজন করা, বিতর্কের উন্নয়নে বিতর্ক কর্মশালা সহ অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করামোট কথা, একজন সংগঠক হিসেবে বিতর্কের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করাই এখন আমার লক্ষ্য।

বিডি ইয়ুথ: একজন সংগঠক হিসেবে এখন পর্যন্ত কি কি পদক্ষেপ নিয়েছেন বিতর্কের উন্নয়নে?

নতুনদের জন্য বিভিন্ন সময় বিতর্ক কর্মশালার আয়োজন করেছি। ১ম ও ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বিতার্কিক অনুসন্ধান কর্মসূচির আয়োজন করেছি। এছাড়াও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পর্যায়ের বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি।

বিডি ইয়ুথ: যদি প্রশ্ন করি, এতদিন বিতর্কের সাথে থেকে কী পেলেন?

সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। অনেক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতে যে আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয় সেটা আমি বিতর্ক থেকেই অর্জন করেছি। আত্মোপলব্ধির জায়গাটা বিস্তৃত হয়েছে। যেকোন ইস্যু নিয়ে এখন অনেক ভালোভাবে চিন্তা করতে পারি, যেটা আগে পারতাম না।

নিয়মিত বিতর্ক চর্চার ফলে একজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে। যেমন, আমি ইতিহাসের ছাত্র। কিন্তু বিতর্কের স্বার্থে আমাকে জ্ঞানের অন্যান্য শাখা সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হচ্ছে। এছাড়াও, বিতর্ক করার ফলে আমার যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষকে কনভিন্স করার ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিডি ইয়ুথ: বর্তমানে যেকোন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দেখা যাচ্ছে বিতার্কিকদের চাইতে বিচারক কিংবা সেখানে উপস্থিত অতিথিদেরকে বেশি হাইলাইট করা হচ্ছে। এ ব্যাপারটা কিভাবে দেখেন?


এটা আসলে বলা কঠিন। এটুকু বলা যেতে পারে, যারা বিতর্কগুলো স্পন্সর করছে তাদের প্রচারের জন্যই এমনটি করে থাকে। তবে, আমার মনে হয় না এতে বিতর্ক চর্চার কোন ক্ষতি হচ্ছে। মিডিয়ার ফোকাস’টা হয়তো ঐদিকে যাচ্ছে, তবে বিতর্কের চাহিদাটা কিন্তু কমছে না।

বিডি ইয়ুথ: আগের চাইতে এখন বিতর্কের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েছে বলেই তো মনে হয়। বর্তমান প্রজন্ম তো বিতর্কের চাইতে ফিল্ম কিংবা ফটোগ্রাফির মতো বিষয়গুলোতেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে?

বিষয়টা আসলে এমন না। এখনও কিন্তু প্রচুর ছেলেমেয়ে বিতর্কে আসছে। পার্থক্য হচ্ছে, আগে ছেলেমেয়েদের হাতে এত অপশন ছিল না, এখন আছে। তাই এমন হচ্ছে। সিম্পল!!

বিডি ইয়ুথ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার ভাবনা কি?

আমাদের এখানে একেকটা হলেই যে পরিমাণ বিতর্ক চর্চা হয় সেখানে অন্য কোথাও এতটা হয় না। এ কারণে বিতর্কে আমরা বরাবরই অন্যদের চেয়ে ভাল করি

তবে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আমাদের সুযোগ সুবিধাগুলো দিনদিন কমছে বৈ বাড়ছে না। পাশাপাশি সেমিস্টার পদ্ধতির ফলে শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে অনেক কম সময় পায়। এজন্যই বিতর্কে আরও উন্নতি করার জন্য প্রশাসনের প্রণোদনা খুবই জরুরী।

শেষে বলবো, যারা বিতর্ক চর্চা করে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। আর জীবনে চলার পথে, কাজে কর্মে, ক্যারিয়ার গঠনে আত্মবিশ্বাস সবচেয়ে মূল্যবান শক্তি। তাই নিজের মধ্যে উপস্থাপন কিংবা বিতর্ক গুণটি থাকলে এটার যত্ন নেয়া উচিৎ। আত্মবিশ্বাস যদি শক্তি হয় বিতর্ক তার প্রধানতম উৎস

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


More news