IUB’র বারিশা: তারকা নয়, শিল্পী হতে চাই



কথা বলছি বারিশা হক’কে নিয়ে। কিভাবে যে তার পরিচয় করিয়ে দেব, তা নিয়ে রীতিমতো বিভ্রান্তিতে আছি!! কোরিওগ্রাফার? নাচিয়ে? মডেল? র‍্যাম্প মডেল? অভিনেত্রী? বিতার্কিক? উপস্থাপিকা? সাংবাদিক? নাকি একজন গৃহিণী হিসেবে!!

এ সবগুলো গুণেই গুণান্বিতা একজন, ‘বারিশা হক’। পড়ছেন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে।

স্নাতক সম্পন্ন করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে কাজ করাই বারিশার লক্ষ্য। পড়ালেখার পাশাপাশি বারিশা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সাথে জড়িত। বারিশা ‘Vibgyor’ ফ্যাশন বুথের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। পাশাপাশি বৈশাখী টিভিতে উপস্থাপিকা হিসেবে ‘স্বপ্ন সদাই’ নামে একটি অনুষ্ঠানে আসবেন খুব শীগ্রই। ইতিমধ্যে ‘স্বপ্ন সদাই’ এর প্রোমো ভিডিওতে অভিনয় করেছেন তিনি। এছাড়াও বারিশা একটি অনলাইন পত্রিকায় টুকটাক লেখালিখি করেন।

বহু-প্রতিভার অধিকারী বারিশা পড়ালেখায় যে কম যায় না তা আগেই জেনেছেন। বারিশা স্কুল এবং কলেজ দুটোই সম্পন্ন করেন শহীদ বীরউত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ নিয়ে। ২০১০ সালে SSC এবং ২০১২ সালে HSCঅসুস্থতার কারণে SSC তে Golden A+ মিস হলেও HSC তে মিস হয়নি।

বারিশার এতো গুণের ভিড়ে প্রথমেই নাচ নিয়ে কথা বলতে হয়। কারণ এটা তার শিল্পী জীবনের প্রথম ভালোবাসা। বারিশা যে শুধু ভালো নাচতে পারে তা নয়, তিনি নাচ শিখানও!! ভার্সিটির অনুষ্ঠানগুলোতে তাই বারিশা অতি পরিচিত মুখ। ভার্সিটির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো তার নাচ এবং কোরিওগ্রাফি অন্যরকম শোভা পায়।

ছোটবেলা থেকেই নাচতে ভালবাসতেন বারিশা। কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে সেভাবে নাচ শেখা হয়নি। SSC পরীক্ষার অবসর সময়ে বারিশা ভাবলেন এই তো মোক্ষম সুযোগ নাচ শেখার। একমুহুর্ত আর দেরি না করে ভর্তি হয়ে যান বুলবুল ললিত কলা একাডেমিতে(বাফা)।

গুরু হিসেবে পান আমিরুল মনি, পার্থ প্রতিম দাস। তাদের কাছেই শিখেন কথ্যক, ফোক, আধুনিক সহ অন্যান্য নাচ। ভারতীয় কিংবদন্তি ড্যান্স মাস্টার ডঃ অর্কদেব ভট্টাচার্য’র কাছে ভরত নাট্যমের উপর একটি ওয়ার্কশপও করেন।

প্রফেশনাল নাচের দুনিয়ায় এভাবেই পা রাখেন বারিশা হক। তারপর কেটে গেছে ৬ বছর। এখনও চলছে নাচের সাধনা। নিজে শেখার পাশাপাশি নিজের বাসায় ছোট ছেলেমেয়েদের নাচ শেখান তিনি।

প্রথম প্রথম কিন্ত পরিবারের কারোই বারিশার নাচ শেখাটা পছন্দ হয়নি। বারিশার বাবা একজন স্থপতি, মা শহীদ বীরউত্তম লে. আনোয়ার গার্লস কলেজ এর অধ্যাপিকা। বাবা-মা হয়তো তাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অন্য কিছু ভেবেছিলেন। কিন্তু একবার কলেজে নাচ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয় বারিশা। তখনই বাবা-মা বুঝতে পারে মেয়ের প্রতিভা আছে নাচে।

তারপর থেকে বাবা-মা হয়ে যায় বারিশার নাচ শেখার অনুপ্রেরণা। বাবা-মার কথাতেই ২০১০ থেকে নিয়মিত BTV’তে এবং পাশাপাশি অন্যান্য টিভি চ্যানেলগুলোতে নাচে অংশগ্রহণ করছেন বারিশা। এ্যাওয়ার্ডও পান। এছাড়া তিনি স্টেজ-শো করেন। BTV’র একজন তালিকাভুক্ত শিল্পী বারিশা। মেয়ের সাফল্য দেখে বারিশার বাবা-মা চেয়েছিলেন বারিশা গানটাও শিখুক!! তবে তা আর শেখা হয়নি বারিশার।

নাচ শেখার আগে ছোটবেলায় বিতর্ক করতে পছন্দ করতেন বারিশা। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় BTV’তে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হয়েছিলেন বারিশা। পাশাপাশি সেবার কুইজ প্রতিযোগিতায়ও প্রথম হন বারিশা। বিতর্ক করার প্রতিভাটা ধরে রেখেছেন আজও।

পাশাপাশি যুক্ত আছেন ভার্সিটির Dance ক্লাব এবং Theater ক্লাবে। সময়ের অভাবে Theater ক্লাবে আগের মত কাজ করতে পারেন না, কিন্তু Dance ক্লাবের একজন সিনিয়র মেম্বার বারিশা।

ফ্যাশন-শো’তেও তার পারফর্মেন্স দর্শকদের মাতিয়ে রাখে। ২০১৫ সালে ‘দীপিকা ইন ঢাকা শো’তে দীপিকার সাথে নেচে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন বারিশা!! ২০১৩ সালে SATV’তে বাংলাদেশি আইডল ‘মং’ এর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন বারিশা। মং সেবার সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন।

এছাড়া YouTubeএ বারিশা অভিনীত বেশকিছু Short Film রয়েছে। বড় পর্দায় অভিনয় করার সুযোগ পেয়েও প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ হিসেবে বললেন, তিনি মিডিয়ার জটিল জগতে পা দিতে চান না। “বারিশা হক শিল্পী হতে চান, তারকা নয়।” বর্তমান সময়ে মিডিয়াতে প্রবেশ করা আগের থেকে অনেক সহজ। এ নিয়ে বারিশার একটু ক্ষোভও আছে। বারিশা চান যথাযোগ্য প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রম দিয়েই তরুণরা মিডিয়ার দুনিয়ায় আসুক।

রোল মডেল কে? জানতে চাইলে তিনি বললেন- “প্রথমত আমার গুরুজি। সোহেল স্যারের নাচ আমার ভাল লাগে। টিনা ম্যাম, জামিল স্যার, আনিকা কবির শখ, নাদিয়া মেম, মৌ ম্যাম এরাও আমার রোল মডেল’’।

জীবনে স্বীকৃতি স্বরূপ তো অনেক পদক পেয়েছেন। সর্বপ্রথম পদক কোনটা? এমন প্রশ্নের জবাবে বারিশা, “ক্লাস ফোরে যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় মিনা কার্টুনের মিনা সেজে লাইফে প্রথম পদক পাই’’।

বারিশা তার জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনার কথা বললেন। একবার বাফাতে নাচ প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। বারিশা নাচার আগে যে মেয়ে নেচেছিল তার হাতের কাচের চুরি ভেঙ্গে স্টেজে পড়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেটা কেউ খেয়াল করেনি। বারিশা নাচতে গিয়ে সেটা লক্ষ্য করে।

কিন্তু বারিশা নাচ থামাননি। ভাঙ্গা কাচের চুরির উপরই নেচে যান বারিশা। এক সময় বারিশার পা কেটে যায় এবং রক্ত ঝরতে থাকে। কিন্তু তবু থামেনি তার নাচ। পরে এ নিয়ে গুরুজিদের দারুণ প্রশংসা পান বারিশা।

বারিশা তার জীবনে কোন কিছুই অপূর্ণ রাখতে চান না। সবকিছুরই অভিজ্ঞতা রাখতে চান। এমনকি একবার কলেজে Fire service এর একটি ট্রেনিং প্রোগ্রাম হয়। সেটাতেও অংশগ্রহণ করে বারিশা সার্টিফিকেট অর্জন করে নেন।

অবসর সময়ে কি করেন জানতে চাইলে বারিশা বলেন, “তিন বছরের সুখের বিবাহিত জীবনে গৃহিণী হিসেবে ঘরে বাইরে সব দিক ম্যানেজ করে, ফ্যামিলিকে সময় দিয়ে অবসর সময়ই আর থাকে না।” এছাড়া মাঝেমাঝে টুকিটাকি লেখালেখি করেন। ফেসবুকে তার লেখা অনেক জনপ্রিয়।

সবকিছু মিলিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি জানতে চাইলে বারিশা যা বললেন-

‘‘প্রথমত একজন ভালো মা হওয়া, আমি যা পূরণ করতে পারিনি আমার সন্তান তা করবে, এই আশা করি। আর কখন কি হয় তা বলা দায়, আমি ১০ বছর আগে ভাবিনি আজ আমার জীবন এরকম হবে। তাই ১০ বছর পর কি হবে সেটা ভাবছিনা। সবই আল্লাহ্‌র ইচ্ছা। তবে সংবাদ উপস্থাপিকা হওয়ার অনেক ইচ্ছা রয়েছে আমার। কিন্তু এই সেক্টরে অনেক চর্চার প্রয়োজন। আমি সেটাই করছি। দেখা যাক কি হয়’’।

বিডি ইয়ুথের সাথে অনেকক্ষণ আড্ডা দেবার শেষদিকে বারিশাকে বললাম, নিজেকে নিয়ে বিশেষ কিছু কি বলার আছে?

বারিশা বললেন-“I always forgive, but I don’t forget”

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

More news