পাওমাংয়ের ছবিওয়ালা



বাতাসে বাঁশির সুর। দলবেঁধে পাহাড়ের পথ কেটে স্কুলে যাচ্ছে ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েরা। সঙ্গে আছে এক যুবক। বাচ্চাদের সঙ্গে পা মিলিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে সে। গন্তব্য পাওমাং। মুরং ভাষায় যার মানে আনন্দ। পাহাড়ি পথের ধারে বাহারি রং খুঁজে বেড়াচ্ছে তার দুটি অনুসন্ধিৎসু চোখ। একটু পরেই তার হাত খেলবে সেই রংগুলোকে নিয়ে।

ঢাকার জ্যামে বসে দৃশ্যটা মাথায় সেট করে নিয়েছিলাম। বাড়ি চিনতে পারব না বলে বাংলামোটর রাস্তার মোড়ে দাঁড়াতে বলেছিলাম। মাথায় ওরকম একটা স্বপ্নিল দৃশ্য গেঁথে থাকার কারণে আশা করেছিলাম ঝাঁকড়া চুলের কোন আর্টিস্ট টাইপ মানুষকে দেখব। দেখি কি? থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর কালো টি-শার্ট পরা এক যুবক হাত বাড়িয়ে বলে উঠল “আমি সুমন”।

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভাবতে লাগলাম, “এই লোক কি তিনি, যে রাস্তায় পড়ে থাকা ফেলনা জিনিসকে ভাবেন নিজের ক্যানভ্যাস! রং তুলির আশ্চর্য ছোঁয়ায় সেই ক্যানভাসকে রাঙ্গান! তৈরি করেন আশ্চর্য সব জিনিস!”

আমার দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে নিজেই বলে উঠলেন, “পাহাড়ের মশার কামড়ে অসুখ করেছিল। চুল সব ছেঁটে ফেলেছি। চলো, আমার স্টুডিও দেখলেই সবার মনের ভাব বদলে যায়”।

হেসে দিলাম। ধীর পায়ে বাড়ির অন্দরে প্রবেশ করলাম। ছিমছাম, শান্ত একটা বাড়ি। বাড়ির মধ্যে এক রুমকে বানিয়েছেন স্টুডিও। রুমজুড়ে ছড়ানো ছিটানো ক্যানভাস। আর রংয়ের গন্ধে ভরপুর সেই রুম! আমার মত অশিল্পের মানুষকেও সেই গন্ধ আবেশিত করে তুলে।

আমি অবাক চোখে তাকালাম আসাদ ইকবাল সুমনের দিকে! একটু আগে আর্টিস্ট ভাবতে পারছিলাম না যাকে, এখন তাকেই মনে হচ্ছে রং তুলির গল্পকার! তার রুপকথার জগতে আমি হারিয়ে গেলাম কিছু সময়ের জন্য। যেন টাইম মেশিনে চড়ে ফিরে গেলাম তার সেই ছেলেবেলায়।

গ্রামের নাম গন্ধা  


সিলেটের গন্ধা গ্রামেই ছোটবেলা কেটেছে সুমনের। তিন বোনের একমাত্র ভাই তিনি। তাই বাবা মায়ের আদরটা সবসময় বেশিই পেয়েছেনপেশায় শিক্ষক বাবা ছিলেন তার কাজের নীরব সমর্থক। বাবার মৃত্যুর পর অবশ্য এটা তিনি আরও ভাল করে বুঝতে পারেন। চাচা ছবি আঁকতেন। তখন ক্লাস টু তে পড়তেন ছোট্ট সুমন। চাচাকে দেখেই ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। তখনকার দিনে গ্রামে ওয়াটার কালার পাওয়া যেত না। চাচা বাজারের গুঁড়ো রং দিয়ে ওয়াটার কালার বানিয়ে দিতেন। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত জেলা ভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোতে তিনি প্রথম হতেন। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণীর পরেই রং নিয়ে আঁকাআঁকির ঝোঁকটা চলে যায়।

এরপর অষ্টম শ্রেণীতে পেন্সিল নিয়ে খাতায় আঁকিবুঁকি করা একটা অভ্যাস হয়ে গেল। কিন্তু সেই অর্থে তাকে পেইন্টিং বলা চলে না। এভাবেই এসএসসি পাশ করলেন। ভর্তি হলেন সরকারি কলেজে। কলেজের শুরুতে কবিতার প্রতি প্রেম জন্মাল। কবিতা থেকেই ধীরে ধীরে আঁকাআঁকির রাস্তা প্রশস্ত হতে লাগল।

বাবা মায়ের ইচ্ছেতে এসএসসি এইচএসসি পাশ করলেন বিজ্ঞান বিভাগ থেকেকিন্তু তারপর মনে হলো, “অনেক হয়েছে! আর না!” অতঃপর ডিগ্রি পড়ার জন্য কলা বিভাগকেই বেছে নিলেন। তখনও আর্ট নিয়ে পড়ার স্বপ্ন অনেক দূরের ভাবনাই ছিল!

জার্নি ফ্রম গন্ধা টু ঢাকা

বিএ পরীক্ষা দেবার পর পাঁচজন বন্ধু মিলে ঢাকায় আসেনউদ্দেশ্য ঢাকা ভ্রমণ। বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন গুণের অধিকারী ছিলেন। সুমন আঁকতেন ভাল, আরেক বন্ধু মঞ্চ অভিনয় করতেনএই বন্ধুরা মিলে মফস্বলে ‘আনন্দ নিকেতন’ নামে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন খুলেছিল। এই সংগঠনে সুমন বাচ্চাদের ড্রয়িং শেখাতেন। ঢাকায় এসে চারুকলাসহ বিভিন্ন আঁকাআঁকির জায়গাগুলো ঘুরে দেখে প্রথমবারের মত সুমনের আত্মপোলব্ধি হয় “এই জায়গাটাই আসলে আমার”। বাড়িতে বাবাকে ফোন দিয়ে জানান তিনি আবার পড়তে চান আর্ট নিয়ে। বাসায় সবাই বলল, “আবার স্নাতক পর্যায়ে পড়াশুনা কেন? একবার তো পড়াশুনা শেষ করলেই!” তখন মাত্র ইউডা (UODA-University of Development Alternative) ফাইন আর্টস বিভাগ খুলেছে। ফাইন আর্টসের থার্ড ব্যাচে ভর্তি হলেন সুমন।

একাডেমিক শিক্ষা মেশিন বানায়, আর্টিস্ট না!


ফাইন আর্টস পড়ার আগে নিজের মতই ছবি আঁকতেন সুমন। তাই লাইন টানার মতো সহজ বিষয় কঠিন লাগা শুরু করল তার কাছে। ইউডাতে যারা পড়তে এসেছিলেন, তাদের সবারই কোন না কোন সময় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আর্ট শেখার ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। একমাত্র সুমনেরই ছিল না। তাই হুট করে একরাশ হতাশা ভর করে মনের উপর।

ঠিক তখনই দেবদূতের মত সুমনের জীবনে এলেন আবদুল আলীম চঞ্চল স্যার। স্যার আলাদাভাবে তাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করতেন কিন্তু কখনও হাতে ধরে কাজ শেখাননি। পাশাপাশি চারুকলার কোচিংয়ে ভর্তি হবারও উপদেশ দেন তিনি। ফলাফলস্বরূপ সেকেন্ড সেমিস্টারে সেকেন্ড হলেন সুমন। সেকেন্ড সেমিস্টারের পর পরিবার থেকে বলা হলো বিদেশে বড়বোনের কাছে চলে যেতে। ভিসা প্রসেসিং এবং আনুষঙ্গিক কাজের জন্য চলে গেলেন ঢাকা থেকে আবার গ্রামে। কিন্তু ঐ সময়টা বড় যন্ত্রণায় কেটেছে সুমনের। দিনরাত শুধু আঁকতেন। খাওয়া দাওয়া, গোসল করা কিছুতেই মন থাকত না তারপেন্সিল স্কেচ শুরু করলেন।

অনেক কাজ জমে যাওয়ার পর ভাবলেন মফস্বলে প্রদর্শনী করবেন তিনি। অদ্ভুত একটা বিষয়! মফস্বলের মত জায়গা মানুষ ছবি প্রদর্শনী বিষয়টা যেখানে বুঝেই না। সেখানে পরপর চারদিন মানুষ বারবার এসেছিল সেই চিত্রকর্ম দেখতে! বোঝার চাইতে দেখার আনন্দেই তারা আসছিল বারবার! এই আশাতীত প্রাপ্তি সুমনকে আবার টেনে আনে ঢাকায়। আবার সেমিস্টারে ভর্তি হলেন। কিন্তু ওদিকে ভিসা চলে এলো। বিদেশের ডাকজীবনে প্রথমবার কঠিন ভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন, “নাহ! বিদেশে না, দেশেই থাকব”।

ইউডার নিয়ম শৃঙ্খলায় আবার জীবন শুরু হলোশিল্পী হৃদয়কে আসলে নিয়মে বেঁধে রাখা কতটা যুক্তিযুক্ত? থার্ড সেমিস্টারে থাকতে অয়েল পেইন্টিংয়ের কাজ শুরু করলে কিছু স্যাররাই নাক সিটকান। বলেন, “অনার্সে কেন? মাস্টার্সে গেলেই পার!”। এসব কারণে ইউডাতে ধীরে ধীরে উপস্থিতি কমতে লাগল। এত কঠিন নিয়মকানুনের একাডেমিক জীবন আর নিতে পারলেন না সুমন। ড্রপআউট করলেন। তার মতে, “কোর্সের পড়াশুনা আমাকে মেশিন বানাচ্ছিল। আমি মেশিন হতে যাইনি, শিল্পী হতে গিয়েছিলাম”

আঁকাআঁকির জীবন  

ইউডা থেকে ড্রপআউটের পরের জীবনটা প্রচণ্ড কঠিন ছিলবন্ধুরা পর্যন্ত টিটকারি করতে পিছপা হয়নি। ওরা বলত “দেখবনে কি করবি তুই!”জেদ চেপে বসল তখন সুমনের মনে। ১২-১৩ ঘণ্টা আঁকাআঁকির মধ্যে ডুবে থাকলেন। তেল, অ্যাক্রেলিক- আর্টের সবজায়গায় ইচ্ছেমত বিচরণ শুরু করলেন। পেছনে চাপ নেই কোন কোর্সের। একটা সময় মনে হলো খালি লাল রং নিয়ে পেইন্টিং করবেন। সেভাবে আঁকা শুরু করলেন একটা সিরিজ। ছবির মধ্যে সবসময় তিনি একটা গল্প বলতে চাইতেন। আত্মপ্রতিকৃতি আঁকলেও তাতে থাকত গল্প। আমরা যখন আড্ডা দিচ্ছিলাম তার কিছুদিন আগেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। একটি অসমাপ্ত চিত্রকর্মের মধ্যে হাসপাতালে কাটানোর সময়ে মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখার গল্প উঠে এসেছে। ‘Illusion’ বিষয়ক কিংবা বহু ব্যবহৃত ‘দা’ দিয়ে নির্মিত চিত্রকর্মের সিরিজ করেছেন তিনি।


জিজ্ঞাসা ছিল, এই চিত্রকর্ম সাধারণ মানুষের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পায়? সুমন বললেন তিনি আউটডোরে অনেক এক্সিবিশন করেছেন। হুট করে একদিন কি মনে হলো! জেনারেল একটা ছবি নিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলে গেলেন। উদ্যানে ছবিটি রেখে দিলেন। বহু মানুষ এসে বিভিন্ন এক্সপ্রেশন দিল ছবি দেখে। একজন চানাচুরওয়ালা ঘুরে ঘুরে দেখে ছবিটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করলেন। সুমন মনে করেন তার আঁকা শিল্পকর্ম কোন নির্দিষ্ট গন্ডির মানুষের জন্য নয়সবার জন্য! গ্যালারিতে এক্সিবিশনে এই আনন্দটা অবশ্য পাওয়া যায় না। শিল্পীর বন্ধু, পরিচিতজন আর মিডিয়া কাভারেজ দিয়েই ভরপুর থাকে গ্যালারি। সাধারণ মানুষের সংস্পর্শ সেখানে থাকে না।

Ornaments Factory

সুমনকে অনলাইন দুনিয়ার মানুষ চেনে Ornaments Factory দিয়ে। নিজে গয়না পরেন। তাই গয়না নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন সেটাই স্বাভাবিক। যেমন, দুটো চেন পেঁচিয়ে একসাথে পরা। একবার নিউমার্কেট থেকে হাতুড়ি কিনে আনলেন। হাতুড়ির কাঠটা দেখে তার অসাধারণ কিছু মনে হলোতাতে রং করে চেন লাগিয়ে বানিয়ে ফেললেন একটি লকেটসহ চেইন। মাটিতে পড়ে থাকা গাছের বীজকে রং করে বানিয়ে ফেললেন শোপিস। তবে শোপিসের চাইতে লকেট নিয়েই প্রচুর কাজ করেছেন তিনি।

আগেকার ভেসপা’তে চাকতি জাতীয় একটি জিনিস পাওয়া যেত, যার নাম দিয়েছিলেন ‘স্পিনো’সেই স্পিনোকে বিভিন্ন রংয়ে রাঙ্গিয়ে লকেট বানিয়েছিলেন। সুমনের কাছে লকেট এক বিরাট ক্যানভাস। বুকের ওপর পড়ে থাকা লকেট হিসেবে ব্যবহার করেছেন ফেলে দেওয়া নানা জিনিস। লকেটের উপরে এঁকেছেন মানুষের মুখ, প্রকৃতির নানা রূপ! এভাবেই সুমনের হাতে ফেলনা জিনিসগুলো রিসাইকেল হয়ে রূপ পায় নতুন গয়নার।

ফেসবুকে পেইজ খুলেন এই ornaments তথা আর্টপিসগুলো বিক্রি করার জন্য। পোস্ট দেওয়ার কদিনের মধ্যেই সব গয়না বিক্রি হয়ে যায়! নতুন শিল্পী সুমনের জীবনকে অনলাইন প্লাটফর্ম অনেকখানি বদলে দিলতার মূল লক্ষ্য ছিল অবজেক্ট খুঁজে সাবজেক্ট বানানো

লোকগাথা

Ornaments Factory ছিল সুমনের একার। কিন্তু শিল্পীর জীবন কখনও এক পথে এগুতে পারে না। তাই শুধু গয়না নয়, অন্যান্য শিল্পকর্মকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার চিন্তা করলেন সুমন। সঙ্গে হাত মেলালেন তানভীর মৃদুল ভাই এবং রানা ভাই। প্রতিষ্ঠিত করলেন ‘লোকগাথা’

লোকগাথা মূলত বাংলার আনাচেকানাচে অনাদরে পড়ে থাকা শিল্পীদের সাপোর্ট দিতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুমনের এক বন্ধু সিলেটে থাকেন, কাঠ দিয়ে দারুণ সুন্দর ঘড়ি বানানতার ঘড়ি এনে জমা করেছেন লোকগাথায়। কিংবা রিকশা পেইন্টার পাপ্পুভাই বোতলের উপর তার পেইন্টিংয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। সেসব সামগ্রী জমা করা হয়েছে লোকগাথায়। শুধু তাই না, সুমন ৫টি ওয়ার্কশপ করিয়েছেন তরুণদেরকে। যাদের আর্ট নিয়ে আগ্রহ আছে, রিসাইকেল নিয়ে আগ্রহ আছে তাদের বিভিন্ন কাজ শেখানো হয় এই ওয়ার্কশপে।


লোকগাথার প্রোডাক্ট এখন সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাই বেচাকেনা এখন আপাতত বন্ধখুব শীঘ্রই আটঘাঁট বেঁধে কাজ শুরু হবে লোকগাথার। ভবিষ্যতে সুমনের ইচ্ছা আছে লোকগাথার মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া প্রত্যেকটা আর্টিস্টকে নিয়ে আলাদা আলাদা এক্সিবিশনের আয়োজন করা।

পাওমাং এবং Coloring little smiles

ছবি আঁকাই শিল্পীর শেষ কথা নয়। শিল্পী জীবনে আছে হাজারো দায়বদ্ধতা। সে দায়বদ্ধতা থেকেই লামা এলাকার দিকে যাত্রা। ওখানে মুরং সম্প্রদায়ের বাস। মুরং সম্প্রদায়ের ছোট ছোট বাচ্চারা মাইলের পর মাইল হেঁটে যাত্রা করে পাওমাং স্কুলে। বিশেষ বিশেষ দিবসে সেখানেই ছুটে যায় একদল তরুণ। সঙ্গে থাকে ছবিওয়ালা সুমন।

বাচ্চাদের হাত ধরে রং করার কিছু পদ্ধতি শেখান তিনিতারপর বাচ্চারা নিজেদের মত রং করে রাঙিয়ে তোলে নিজের মনের কথা। পাহাড়ি বাচ্চাদের রং খুব শান্ত আর ঠাণ্ডা অনুভুতির। সুমন মনে করেন পরিবেশ অনেকটাই প্রভাব ফেলে রং নির্ধারণের ক্ষেত্রে। মোট ৩ বার গিয়েছেন পাওমাংয়ে। প্রথমবার বাচ্চাদের আঁকা ৪৪টা ছবি নিয়ে আসেন ঢাকায় সবাই ছবিগুলো দেখে প্রচুর প্রশংসা করে।

Coloring little smiles’ এর সঙ্গে দুই বছর ধরে আছেন। এর অধীনে সুমন ঢাকার পথশিশুদের ড্রয়িং শেখান। ঢাকার পথশিশুদের রং নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটা অস্থিরতা দেখা যায়। শহুরে যান্ত্রিকতাই এর মূল কারণ। ঈদের দিনগুলোতে সুমন এবং তার বন্ধুরা বেরিয়ে পড়েন পথশিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে। তাদের পছন্দ অনুযায়ী জামা কাপড় কিনে দেন। এভাবেই ক্যানভাসের বাহিরের পৃথিবীতেও রং ছড়িয়ে দেন সুমন

অতঃপর ছবিওয়ালা


কবিতা আর ছবির মধ্যে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পান তিনি। কবিতার বইও বের হয়েছিল ‘অগ্রদূত প্রকাশনী’ থেকে। কিন্তু এ নিয়ে এক দুঃখগাথা আছে। বাবাকে নিজের কবিতার বই দেখাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রকাশকের খামখেয়ালিতে বেঁচে থাকতেই কবিতার বই দেখাতে পারেননি বাবাকেবই প্রকাশ যখন হয় তখন বাবা কোমায় চলে গেছেন, স্বাভাবিক বোধবুদ্ধির বাইরে। তাই প্রকাশককে আজও ক্ষমা করতে পারেননি সুমন। জমে আছে অসন্তোষ।

আর্টিস্ট বলতে একমাত্র বুঝেন শিল্পী সুলতানকে। সুলতানের জীবনযাপনে, আচার-ব্যবহারে সত্যিকারের শিল্পীসত্তা ফুটে ওঠে। অনুপ্রাণিত হন স্প্যানিশ আর্টিস্ট সালভেদর দালির ছবি দেখে। ছবির মধ্যে গল্প বিনির্মাণ করা দালির কাছেই শিখেছেন।

ফটোগ্রাফি করেন। বেহালা বাজানো শিখছেন একজন আপুর কাছে। ভবিষ্যতে ফিল্ম বানানোর ইচ্ছা। একজন আর্টিস্টের ভিতর হঠাৎ করেই ভ্যানগগ ভর করবে, এরকম একটা কাহিনী ঠিক করে রেখেছেন ফিল্মের জন্য।

যেসব বন্ধুরা এককালে তাকে নিয়ে মজা করেছিলেন, তারাই আজকাল প্রশংসা করেন। তবুও অতৃপ্তি তার চিরজীবনের সঙ্গী। তবে এই অতৃপ্তি তাকে নতুন করে কাজ করার প্রেরণা যোগায়। তাড়াতাড়ি করে ৫০-৬০টা ছবি আঁকার পক্ষপাতি তিনি নন। কোন কোন ছবি আঁকতে তার বছরের পর বছর লেগে গিয়েছে। পরিকল্পনামাফিক বাঁধাধরা জীবন তার পছন্দ না। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? এই প্রশ্ন করা বোকামি!

আড্ডা শেষে মাথার পেছনে এক ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “বলতো এর মানে কি?”

একটি আত্মপ্রতিকৃতি! মাথার উপর পাখির বাসা। আমার সোজাসাপ্টা জবাব, “আপনার মাথার ভিতর পাখি বাস করছে!”

রং-তুলির রূপকার সুমনের সাথে সারা ঘর যেন হো হো করে হেসে উঠলবললেন, “নাহ! এই ছবির মানে পরজন্মে আমি পাখি হব”।

সুমনের অন্তর্মুখী জীবন যান্ত্রিক জীবনের পাঁয়তারা থেকে বাঁচতে পাখি হতে চায়! যার নির্দিষ্ট কোন গণ্ডি থাকবে না, থাকবে না কোন পিছুটান। থাকবে একটা খোলা আকাশযেটাই হবে তার একমাত্র ক্যানভাস।

নিজস্ব প্রতিবেদক


More news