চবি’র ইরফান: অজানা উড়ন্ত বস্তু’র দুরন্ত গায়েন!!



অজানা উড়ন্ত বস্তু একটি স্বপ্নের নাম যে স্বপ্নের যাত্রা শুরু হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উদ্যমী ও স্বপ্নকাতর তরুণদের মাধ্যমে গান যাদের ভালবাসা ছিল গানই তাদের একত্রিত করেছে যাদের সুরে প্রায় প্রতিদিন চবির সমাজ বিজ্ঞান ঝুপড়ি(অনুষদ বিল্ডিং) মেতে ওঠে প্রবল উন্মাদনায়!! শিল্পকলা চত্বর, ষোলশহর আর স্টেশন চত্বরে তাদের নিয়মিত গাইতে শোনা যায়।

ভালবাসা থেকেই শুরু হয়ে যায় তাদের স্বপ্ন দেখা। স্বপ্ন হলো, “একদিন পৃথিবীর ঘোরগ্রস্থ এবং ঘোরবিহীন মানুষগুলো আমাদের গান শুনবে। ঘুম থেকে উঠা নিষ্পাপ কিশোরী আমাদের গান শুনবে, রাতে ঘুমাবার আগে কানে হেডফোন গুঁজে নাবালক ছেলেটি আমাদের গান শুনবে!! মানুষে ভরা কিন্তু খোলা প্রান্তরে কেউ আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে আমাদের গান গাইবে!! এক নিঃশ্বাসে যেন বলে ফেললেন অজানা উড়ন্ত বস্তু নামক স্বপ্নের অদ্যপান্ত

হ্যাঁ, আমাদের সাথে আজ আড্ডায় আছেন অজানা উড়ন্ত বস্তু’ ব্যান্ডের ভোকাল ও বংশীবাদক ‘সাঈদ মুহাম্মদ ইরফান’

বিডি ইয়ুথ: কেমন আছেন?

এই তো আছি ভালোই  

বিডি ইয়ুথ: শুরুতেই পরিচিত হয়ে নেয়া যাক।

আমি সাঈদ মুহাম্মদ ইরফান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসন বিভাগে ২য় বর্ষে পড়িআমার ব্যান্ডঅজানা উড়ন্ত বস্তু এই ব্যান্ডে আমি গান গাওয়া এবং বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করি মাত্র!! গিটারে আছেন হাসান মাহমুদ টিপু, এবং মোহাম্মদ ওমর মুন বেইজ বাজান অভিজিত দেব রোহিত এবং ড্রামসে আছেন শাওন তালুকদার। আমি আর সাকিব দুইজন ভোকালে আছি।

বিডি ইয়ুথ: গানের হাতেখড়ি কখন?


ওইভাবে কিন্তু কখনো হাতেখড়ি হয়নি। শৈশবে বাবা গান শেখার জন্য বলেছিলেন বটে। কিন্তু আমি লজ্জায় ভর্তি হয়নি। তবে বাবা গান করতেন। বাবার থেকেই হাতেখড়ি বলা যায়। প্রথম গাওয়া গান ছিল, ‘আহা... আজি এ বসন্তে’। তখন বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর

বিডি ইয়ুথ: বন্ধুতা থেকে দল, নাকি দল থেকে বন্ধুতা?

অবশ্যই বন্ধুতা থেকে দল। এই চবি ক্যাম্পাস, ঝুপড়ি, বন্ধুত্ব, আড্ডা, একসাথে গান গাইতে গাইতেই আজকের এই ব্যান্ড।

বিডি ইয়ুথ: ব্যান্ডের যাত্রা শুরু কিভাবে?

ব্যান্ডের সবাই যার যার মত করে মিউজিক করত। প্রথম থেকেই আমরা সবাই বন্ধু ছিলাম। তো সব বন্ধুরা প্রায় সময়ই ষোলশহর আর চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমিতে আড্ডা দিতাম। গান বাজনা করতাম। ওখান থেকে একদিন এ্যাশেজ ব্যান্ড এর জুনায়েদ ইভান ভাই বলেন, “একটা প্রোগ্রাম আছে করে ফেল।”

এছাড়া ক্যাম্পাসের সনি ভাই এবং প্রসূন দা একদিন বলেন, “উদীচীর প্রোগ্রাম, তোরা পারফর্ম করবি।” আমরা সবাই আকাশ থেকে পড়লাম!! হাতে আছে মাত্র ১০ দিন! তারপর আস্তে আস্তে কাজ শুরু করে দিলাম। ব্যান্ড ম্যানেজার ইমতিয়াজ রায়হান আসিফ নাম দিল অজানা উড়ন্ত বস্তু এটি মহীনের ঘোড়াগুলির একটা গানের নাম। ব্যান্ডের অফিসিয়াল যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ভালবাসা দিবসে সেদিনই আমরা উদীচীর বসন্তবরণ উৎসবে পারফর্ম করি

বিডি ইয়ুথ: কোন কোন দেশি বা বিদেশি ব্যান্ডের গান ভালো লাগে? আর এমন কোন ব্যান্ড যাদের ফলো করতে ইচ্ছে হয়?


 

প্রিয় তো অনেক ব্যান্ডই আছে। দেশি ব্যান্ডগুলোর মধ্যে বয়েছে- মেঘদল, ওয়ারফেজ, আর্ক, জেমস। আর দেশের বাহিরের মধ্যে বয়েছে- মহীনের ঘোড়াগুলি, স্করপিয়ন্স, বিটলস, কুইন, ডায়ার স্ট্রেটস। এদের মধ্যে অবশ্য স্করপিয়ন্স’কে বেশি অ্যাডমির‍্যাবল মনে হয়। ফলো করা বলতে যেটা বোঝালেন

বিডি ইয়ুথ: কোন ধাঁচের গান গাইতে বেশি স্বাচ্ছ্যন্দ্য বোধ করেন? ব্যান্ডের কোন ধরনের গানের শ্রোতা-ভক্ত বেশি?

রক ধাঁচের গান গাইতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আসলে আপনি সব ধরনের গানেরই বেশ ভাল ভক্ত পেয়ে থাকবেন। আপনি ইউটিউবে বিভিন্ন ধাঁচের মিউজিকের প্রায় সমপরিমাণ ভিউ দেখতে পাবেন। তবে, রক ভক্ত কিন্তু চিরকাল থাকবে

বিডি ইয়ুথ: প্রথম স্টেজ-শো, অনুভুতিটা কেমন ছিল?

সত্যি বলতে এখনো বুঝতে পারি না অনুভূতিটা কেমন ছিলো স্টেজে উঠার পরপরই আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি!! হা হা হা..

বিডি ইয়ুথ: এই নিয়ে কতগুলো স্টেজ শো করা হলো? কোন বিশেষ ঘটনা স্টেজ শো নিয়ে?

প্রায় ১৯টা হবে। বেশ কিছু মজার ঘটনা আছে। তবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, একবার ‘কনসার্ট ফর মা’তে পারফর্ম করছিলাম সেদিন ছিল বাংলাদেশ বনাম ভারতের খেলা। তো, খেলার কারণে অডিয়েন্স তেমন নেই। মন খারাপ করে সবাই বসে আছি। স্টেজে উঠলাম।

তেমন কেউ নেই, প্রজেক্টরের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। আমরা তবু আমাদের মত করে রেডি হতে লাগলাম। শুরুতেই সাউন্ড চেকের পরে আমাদেরকে খুব অবাক করে দিয়ে হুড়মুড় করে মানুষ ঢুকতে শুরু করলো সে সময় আমরা ইন্সট্রুমেন্টাল করছিলাম। পরে ব্যাপারটা এমন হলো যে বিশ্বাস করতে পারবেন না সবাই এমনভাবে গান করছিল, আমি ইনপুটে আমার বাঁশির আওয়াজই পাচ্ছিলাম না। অসাধারণ অনুভুতি!!

বিডি ইয়ুথ: এ যাবৎ কোন অ্যালবাম কি রিলিজ হয়েছে?


 

এখনো কোন অ্যালবাম রিলিজ হয়নি, শুধু স্টেজ নিয়েই আছি আপাতত ভবিষ্যতে অবশ্যই ইচ্ছা আছে। সেজন্য কাজ করে যাচ্ছি। প্র্যাকটিস করছি, নিজেদের আরো ভালভাবে রেডি করছি।

বিডি ইয়ুথ: পরিবার থেকে অনুপ্রেরণা পান কি? এছাড়া কোন বিশেষ ঘটনা বা মানুষ যারা আপনাকে ইন্সপায়ার করে বলে মনে করেন?

কেউ কেউ পায়, কেউ কেউ পায় না। তবে আমি ভাগ্যবান যে, পরিবার থেকে সাপোর্টটা তুলে আনতে পেরেছিএখানে আসলে একটা ব্যাপার না বললেই নয়। প্রথমেই আপনাকে দেখাতে হবে, আপনি যা করছেন তার ফলাফল কেমন এবং মানুষ কিভাবে নিচ্ছে। এই ব্যাপারগুলো যতটা পজিটিভভাবে ফ্যামিলিকে মানাতে পারবেন, ফ্যামিলিও ততোটা পজিটিভভাবে আপনাকে এবং আপনার স্বপ্নকে গ্রহণ করবে। আর হ্যাঁ, বিশেষ মানুষদের বলতে, ব্যান্ডমেটরা নানা ঝামেলার মাঝে, বিশেষ করে পারিবারিক সমস্যার মধ্যেও মিউজিক চালিয়ে যাচ্ছে তাদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা। তারাই আমার প্রধান অনুপ্রেরণা।

বিডি ইয়ুথ: পড়াশুনা আর গান, কিভাবে ম্যানেজ করেন?

হা হা হা.....২৩ বছর বয়সে এসে আসলে এই টেকনিক শেখাই যায়। আর একটু চেষ্টা তো করতেই হয়। তবেই সব ঠিক!!

বিডি ইয়ুথ: কেন গান? কেন অন্য কিছু নয়?


অন্য কিছু করি না তা তো বলিনি!! আপনিই তো গান নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করলেন! তবে এটা ঠিক, গান দিয়ে মনে হয় সবার চোখে পড়েছি বলেই আপনারা ইন্টারভিউ নিচ্ছেন! চোখে পড়াটাই কিন্তু আসল, তাই না!!

বিডি ইয়ুথ: ১০ বছর পরে এই ব্যান্ডকে কোথায় দেখতে চান?  

স্বপ্নটা আকাশ ছোঁয়া আর “The sky has no limit”

বিডি ইয়ুথ: গানকে পেশা হিসেবে দেখেন কি?

আমি কোন কিছুকেই পেশা হিসেবে দেখি না। সবই কাজ। যার যেটা ভলো লাগে করবে। আমার গান ভলো লাগে। তবে ভালো লাগার কাজ যদি পেশা হয় তবে মন্দ হয় না।

বিডি ইয়ুথ: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যান্ড গানের সবচেয়ে বড় সমস্যা কি বলে মনে করেন? কোন এক্সপেরিয়েন্স?  

বড় সমস্যা, মনমানসিকতা। ঢাকার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শো করতে গিয়েছিলাম। এবং সেখানে তারা হিন্দি গানের জন্য রিকোয়েস্ট করতে থাকে!! আমাদের ভার্সিটির এক ডিপার্টমেন্টের নবীনবরণ প্রোগ্রামে আমাদের এক প্রফেসর এসে বলেন, একটু নাচার গান করো, হিন্দি গান করো কয়েকটা। আমরা তখুনি স্টেজ থেকে নেমে যাই এর থেকে লজ্জার আর কি হতে পারে? এই মনমানসিকতা ত্যাগ করতে হবে আমাদের

বিডি ইয়ুথ: পাঠক ও শ্রোতাদের উদ্দ্যেশ্যে কিছু বলুন।


পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, আপনারা সিডি কিনুন। ভাল গান শুনুন, যারা এসব কাজে লেগে আছে, তাদের উৎসাহিত করুন।

আর আপনারা এক্সপ্লোর করুন। কারণ, আপনি কোন জায়গায় প্রবেশ না করলে কখনোই জানতে পারবেন না, আপনি সেই সেক্টরে কতটা পারদর্শী। আর আমাদের পাশে থাকবেন যাতে আমরা আমাদের ভার্সিটিকে, আমাদের দেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারি।

আমরা জানি আমরা পারব, যদি আপনারা থাকেন পাশে। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, স্বপ্ন দেখতে হয় চলুন স্বপ্ন দেখি!!

হয়ত এই বস্তুটিকে আকড়ে ধরে উড়তে উড়তেই অজানায় হারিয়ে যাব। তবে রেশ রেখে যাব। কথা দিচ্ছিধন্যবাদ, সবাই ভাল থাকবেন।

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


More news